মুন্সীগঞ্জে দালান সভ্যতার ইতিকথা ॥

0 41

আতিকুর রহমান টিপু : মুন্সীগঞ্জ জেলা শহরে বর্তমানে দিন দিন তৈরী হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের নতুন নতুন দালান। যেদিকে তাকাই সেদিকেই শুধু সারি সারি দালান। মনে হয় এ যেন এক রুপ কথার রাজ্য। কোন দালান কার আগে মাথা উচু করে দাড়াবে তার প্রতিযোগিতায় যেন পিছিয়ে নেই। কোথাও কোথাও গুলশান বনানী স্ট্রাইলে তৈরী হচ্ছে দালান। চারিদিকে ইট প্রাসাদের দালানের সারি দেখে অবাক হবার গল্প যেন হার মানে আজ। কবির কবিতার মত যেন তার রুপ। এ দালান সভ্যতার পরিমন্ডল অবলোকন করে কবির মনে যেন বান ডাকে আজ।

কোথায় ছিলে হে সভ্যতা
কেন ছিলে থেমে,
কোথা থেকে হঠাৎ
আসলে যে নেমে!!
চারিদিকে হুট করে
দালানের বাড়ী,
রাস্তা জুড়ে আপন মনে
চলছে শুধু গাড়ী ॥

কবির কবিতার মতই যেন মুন্সীগঞ্জ জেলা শহরে আজ সেজেছে। আজ থেকে প্রায় এক দশক পূর্বে শহরে দালান ছিল হাতে গোনা কিছু মাত্র। যা দেখে অনেক সময় মনে হত শহরটা যেন ভীষন ফাঁকা। পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতে প্রচুর দালান চোখে পরলেও আমাদের জেলা শহরে গ্রামীণ পরিবেশটাই ছিল বিদ্যমান। ঢাকা থেকে মানিকপুর মহল্লায় ২০০৮ সালের দিকে আমার এক বন্ধুর বেয়াই (ঢাকাইয়া কুট্টি) এসে ২ দিন বেড়িয়ে যায়। যাবার সময় তার শেষ কথা ছিল তা নিজস্ব ভাষায় “এ শহর এত ফাকা কেলা” মানে কোন ইট পাথরের দালান তেমন নেই। এটাই ছিল তার বক্তব্য।
তখন মানিকপুরে সোহেল সাহেবদের চারতালা দালান ছিল একটা গর্ব মানিকপুরের। কেউ রিক্সায় চেপে মানিকপুরে এলে বলতে হত চারতালার উত্তরে বা দক্ষিনে যাব।
প্রতিটা মহল্লায় এমনই গল্প ছিল। ‌দুই চারটা পুরনো একতলা বিশিষ্ট ভবন ছাড়া তেমন কোন বিল্ডিং চোখে পরতোনা। শহরে দ্বিতল পৌর মার্কেট ছিল গর্বের বিষয়। বাজার রোডে ইসলাম মার্কেট, সরকার মার্কেট ও জেলা পরিষদ মার্কেট ছিল ব্যাতিক্রম। আজ যেন সব কিছুরই ইতিহাস ভিন্ন। প্রথম নয় তলা বিশিষ্ট জিএস সিটি সেন্টার দিয়েই জমজমাট মার্কেট ভবন তৈরীর যাত্রা শুরু। এর পরের গল্প আর বলার অপেক্ষা রাখেনা। ধারাবাহিকতা যেন লাগামহীন ভাবে ছুটে চলেছে। মাত্র ১০ বছরের ব্যবধানে এখন জেলা শহরের রাস্তার দুই পাশে প্রচুর বহুতল বিশিষ্ট মার্কেট তৈরী হয়েছে। হয়েছে ভবন। যা এখন বর্তমানে দৃষ্টিনন্দন রুপ পেয়েছে। এই জেলার অনেক প্রবাসী দীর্ঘ সময় পরে দেশে আসার পর এই দৃষ্টিনন্দন ভবনের সারি দেখে বিস্মিত হয়ে বলে, “কি দেখছি আমি”। বিদেশ যাওয়ার সময় যে শহর সে দেখে গেছে আজ যেন ভিন্ন মাত্রায় তার সাজসজ্জা। অবাক না হবার কারনও অবশিষ্ট থাকে না। এক সময় এই শহরের অধিবাসীরা বিভিন্ন উৎসবে কেনা কাটার জন্য পাশর্^বর্তী শহর ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ মুখী থাকলেও আজ আর সেই অবস্থা নেই। জেলা শহরের মার্কেট থেকেই কেনা কাটা করছে সবাই।
পাশ্ববর্তী মুন্সির হাটের আশ পাশ এলাকার যেদিকে চোখ যায় সেদিকেই যেন মাথা উচু করে দাড়িয়ে আছে দালান। মানিকপুর ও মাঠপাড়া দালানের স্বর্গরাজ্যে পরিনত হয়েছে আজ। পাঁচ ঘুড়িয়া কান্দি মহল্লার পূর্ব পাশে গুলশান স্ট্রাইলে অনেকগুলো দালান নির্মিত হয়েছে। এখন বলতে গেলে শহরের প্রতিটা মহল্লায় কম বেশী ভবনের সারি চোখে পড়ে। মহল্লায় নিজস্ব দালান না হলে যেন মানুষের সম্মানই থাকেনা এমন- মনোভাব যেন সৃষ্টি হয়েছে সকলের। খুব দরিদ্র মহল্লা গনকপাড়াতেও এর প্রভাব এখন চোখে পড়ে। ১০ তলা দালান এখন শহরের অনেক প্রান্তেই চোখে পড়বে। আর এ দালান সভ্যতার নির্মান কারিগর হলো চর আঞ্চলের অধিবাসীরা।
মাত্র ১০ বছরের ব্যবধানে আজ এ দালান সভ্যতার এতদুর অগ্রগতি। জেলা শহরই শুধু নয় এর প্রভাব তার পল্লী এলাকয়াও দেখা যাচ্ছে ইদানিং। প্রায় গ্রামে একতলা পাকা দালান এখন চোখে পড়ে। আজ যেসব যায়গায় ভবন নির্মিত হচ্ছে। প্রায় দুই দশক পূর্বেও সব ছিল কৃষি জমি। রাত গভীর হলেই শোনা যেত শেয়ালের ডাক আর কুপ পাখির কুপ কুপ শব্দ। আজ যেন সবই স্বপ্ন।
আর পদ্মা সেতু হয়ে গেলে প্রায় ১০ বছরের মধ্যে পদ্মা, মেঘনা, ধলেশরী ও ইছামতি বিধৌত এই জনপদ দ্বিতীয় সিঙ্গাপুরে পরিনত হবে তা বলার অপেক্ষা রাখেনা এমনই মন্তব্য অনেকের। কারন, একগলির মুন্সীগঞ্জ জেলা শহর খাল ভরাট হবার পর দুই গলি ও অসখ্য উপগলির শহরে পরিনত হয়েছে আজ। পদ্মা সেতু নির্মান শেষ হলে এর প্রভাবে মুন্সীগঞ্জ শহর দৃষ্টিনন্দন শহরে পরিনত হবে। আজ সেই যাত্রা শুরু হয়েছে ভবন সভ্যতার মাধ্যমে।

Leave A Reply

Your email address will not be published.

%d bloggers like this: