রমজান : পুণ্যলাভের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম

3

অনলাইন ডেস্ক:  বছর ঘুরে আবার এসেছে পবিত্র মাহে রমজান। এই মাস নাজাতের মাস। নিজের জীবনের সকল পাপ মোচনের মাস। বরকতময় মাস। দোয়া কবুলের মাস। এই বরকত ও ফজিলতপূর্ণ মাস হলো প্রতিটি মোমেনের জন্য পুণ্যলাভের উৎসবের মাস। রোজা একজন বান্দার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ফরজ। পবিত্র কোরআনুল কারীমে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের প্রতি; যাতে তোমরা তাকওয়া অবলম্বনকারী মুত্তাকি-পরহেজগার হতে পারো।’ (সুরা বাকারা) অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে, ‘সুতরাং তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এ মাস (রমজান) পাবে, সে যেন অবশ্যই তার রোজা রাখে।’ (সুরা বাকারা)

রমজানের ফজিলত বর্ণনা করতে গিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘আল্লাহ তায়ালার কসম! মুসলমানদের জন্য রমজানের চেয়ে উত্তম কোনো মাস আসেনি এবং মুনাফিকদের জন্য রমজান মাসের চেয়ে অধিক ক্ষতির মাসও আর আসেনি। কেননা মুমিনগণ এ মাসে গোটা বছরের জন্য ইবাদতের শক্তি ও পাথেয় সংগ্রহ করে। আর মুনাফিকরা এতে মানুষের উদাসীনতা ও দোষত্রুটি অন্বেষণ করে। এ মাস মুমিনের জন্য গণিমত আর মুনাফিকের জন্য ক্ষতির কারণ। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ৮৩৬৮)। হজরত আবু হুরায়রা রাদি-আল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া-সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, আদম সন্তানের প্রতিটি নেক আমল দশ গুণ থেকে সাতশ গুণ পর্যন্ত বাড়ানো হয়ে থাকে। মহান আল্লাহ তায়ালা জাল্লা শানহু বলেন, কিন্তু রোজা এর ব্যতিক্রম। কেননা, রোজা একমাত্র আমারই জন্য রাখা হয়, আর আমিই এর প্রতিদান দিব। বান্দা আমারই জন্য নিজের কামনা ও পানাহার পরিহার করে থাকে। রোজাদারের জন্য দুটি আনন্দ রয়েছে, একটি হলো ইফতারের সময় এবং অপরটি হলো (পরকালে) তার প্রতিপালকের সাথে সাক্ষাৎ লাভের সময়। নিশ্চয়ই রোজাদারের মুখের গন্ধ-মহান আল্লাহ তায়ালা জাল্লা শানহুর নিকট মিশকের সুগন্ধি থেকেও অধিক সুগন্ধময়। রোজা হলো ঢাল স্বরূপ। সুতরাং যখন তোমাদের কারো রোজার দিন আসে, সে অশ্লীল কথাবার্তা বলবে না এবং গন্ডগোল করবে না। তাকে যদি কেউ কূট কথা বলে অথবা লড়াই করতে চায় তবে সে যেন বলে আমি একজন রোজাদার।’ (বুখারি ও মুসলিম)

আল্লাহর তায়ালার বদলা নিশ্চয়ই অতুলনীয়। এই ঘোষিত ফজিলতপূর্ণ মাস রমজান মাস একজন মোমেনের জন্য নেয়ামতস্বরূপ। প্রত্যেক মোমেনের জন্য নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা জরুরি। আর এই নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় তখনই হবে যখন একজন মোমেন দুনিয়ার সকল মোহ ত্যাগ করে, সব ধরণের প্রস্তুতি নিয়ে, এই মাসকে সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাবে। আল্লাহর পক্ষ হতে পুরস্কার মনে করে পুরস্কার গ্রহণ করবে এবং সে এটাকে পুণ্য কামানোর মহা সুযোগ মনে করে পুরোপুরি আমলে লেগে যাবে। সুতরাং এই পবিত্র রমজান মাসে অধিক হারে নেক আমল করার চেষ্টা করা প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর জন্য একান্ত আবশ্যক। বিশেষ করে রমজানের শেষ দশকে। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, ‘যখন রমজানের শেষ দশক এসে যেত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন রাত্রি জাগরণ করতেন, পরিবারবর্গকে নিদ্রা থেকে জাগিয়ে দিতেন, লুঙ্গি শক্ত ও ভালো করে বেঁধে (প্রস্তুতি গ্রহণ) নিতেন।’ (মুসলিম, হাদিস : ১১৭৪)

এই ফজিলতপূর্ণ মাসে বেশি বেশি পুণ্য কামানোর জন্য নিম্নোক্ত আমলগুলো করা যেতে পারে। তাহলে এই মহিমান্বিত মাসের যথাযথ সম্মান হবে। ১. রোজা রাখা, যা প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক বালক-বালিকার জন্য ফরজ। যার ফজিলত আমরা উপরে বর্ণনা করে এসেছি। ২. বেশি বেশি কোরআন তেলাওয়াত করা। কেননা, এই কোরআন আপনার জন্য কেয়ামতের দিন সুপারিশ করবে। এবং প্রতিটি হরফে আপনি ৭০ নেকি করে পাচ্ছেন। এতেই আপনার পুণ্যের ভান্ডার জমে যাচ্ছে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘রোজা ও কোরআন কিয়ামতের দিন মানুষের জন্য সুপারিশ করবে…।’ (আহমাদ, হাদিস : ৬৬২৬)। ৩. কিয়ামু রমাদান তথা তারাবি নামাজ আদায় করা। হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি ইমানের সঙ্গে সওয়াব হাসিলের আশায় রমজানে কিয়ামু রমাদান (সালাতুত তারাবি) আদায় করবে, তার অতীতের সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।’ (বোখারি, হাদিস : ২০০৯)। ৪. তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করা। আমরা সাধারণত পুরো বছর তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করার সুযোগ পাই না বিভিন্ন কারণে। এই রমজান মাসে তাহাজ্জুদ নিয়মিত পড়ার একটা সুযোগ থাকে। তাই আমরা এই সুযোগটাকে কাজে লাগাবো। প্রতিদিন সাহরি খাবার আগে বা পড়ে দুই রাকাআত বা চার রাকাআত করে পড়ে নিবো। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রমজান মাস লাভকারী ব্যক্তি, যিনি উত্তমরূপে সিয়াম ও কিয়াম পালন করে, তার প্রথম পুরস্কার- রমজান শেষে গুনাহ থেকে ওই দিনের মতো পবিত্র হয় যেদিন মায়ের গর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হয়েছিল। (মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, হাদিস : ৮৯৬৬)। ৫. শেষ দশকে ইতিকাফ করা। আমল করার একটা সুবর্ণ সুযোগ হলো এতেকাফ করার মাধ্যমে। কারণ, মসজিদে আমল করার মমনমানসিকতা ও পরিবেশ বজায় থাকে। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করতেন।’ (মুসলিম, হাদিস : ১১৭১)। ৬. ওমরাহ আদায় করা। রমজানে একটি ওমরা আদায় করলে অন্য মাসে ৭০টি ওমরাহ করার সওয়াব হয়। তাই এ মাসে ওমরাহ আদায় করাটাও অনেক বড় সওয়াবের কাজ। অবশ্য এখন পরিস্থিতির কারণে সম্ভব নয়। এ প্রসঙ্গে এক বর্ণনায় এসেছে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘রমজান মাসে ওমরাহ আদায় আমার সঙ্গে হজ আদায়ের সমতুল্য।’ (মাজমাউল কাবির, হাদিস ৭২২; জামেউল আহাদিস, হাদিস : ১৪৩৭৯)। ৭. বেশি বেশি জিকির-আজকার করা। আমরা তো অধিকাংশ সময় কাটিয়ে দিই অহেতুক কথাবার্তায়। অথচ আমরা চাইলেই পারি ওই সময়গুলোতে তাসবীহ-তাহলীল করে কাটাতে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘মুমিনরা! তোমরা আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করো এবং সকাল-বিকেল আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা করো। (সুরা আহজাব, আয়াত : ৪১-৪২)। ৮. নিজের সাধ্যমতো অন্যকে সদকা করা। রমজানের গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, দান-সাদকাহ করা। কারণ আমাদের প্রিয় নবীজি এই মাসে এ-কাজটি খুব বেশি বেশি করতেন। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ দানশীল। রমজানে তিনি আরো অধিক দানশীল হতেন, যখন জিবরাইল (আ.) তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন। আর রমজানের প্রতি রাতেই জিবরাইল (আ.) তাঁর সঙ্গে দেখা করতেন এবং তাঁরা একে অন্যকে কোরআন তিলাওয়াত করে শোনাতেন। (বুখারি, হাদিস : ৬)

উপরোক্ত কাজগুলোর সাথে সাথে বেশি বেশি দোয়ায় গুরুত্ব দেওয়া। বিশেষ করে ইফতারের সময়। হাদিসে এসেছে- ‘অবশ্যই আল্লাহ তায়ালা রমজান মাসে প্রতি ইফতারের সময় অসংখ্য ব্যক্তিকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করেন। প্রতি রাতেই তা হয়ে থাকে। (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ১৬৪৩)। এই পবিত্র রমজানে পুণ্য কামানোর সহজ উপায় যদি বলি তাহলে অনেক উপায় রয়েছে। বিশেষ করে সময়মতো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা, নিজে সহিহভাবে কোরআন তেলাওয়াত করা এবং অন্যকে শেখানো। সময়মতো সাহরি ও ইফতার করা। দুরূদ শরিফ পাঠ করা, বেশি বেশি দান তওবা করা। এরকম আরো অনেক পূণ্য কাজ রয়েছে সেগুলো আমাদের জীবনে বাস্তবায়ন করা। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সঠিক বোঝার ও সঠিকভাবে আমল করার মাধ্যমে এই মহিমান্বিত রমজান মাসে পরিপূর্ণ পুণ্য কামানোর তৌফিক দান করুন। জান্নাত লাভের ও জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়ার তৌফিক দান করুন। আমিন।

উসমান বিন . আলিম,লেখক : মুহাদ্দিস, পরিচালক, বাংলাদেশ কওমি তরুণ লেখক ফোরাম

Comments are closed.

%d bloggers like this: