Ultimate magazine theme for WordPress.

রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের

0 29

একসময় দেশের পুঁজিবাজারে দৌর্দণ্ড প্রতাপ ছিল রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি)। অনেকেই আইসিবিকে পুঁজিবাজারে ভাগ্যনিয়ন্ত্রক হিসেবে বিবেচনা করত। আইসিবি যে কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করত অন্য সব প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি বিনিয়োগকারীরাও তা অনুসরণ করত। তবে কালের পরিক্রমায় আইসিবির সেই প্রতাপ আর নেই। ক্রমেই পুঁজিবাজারে আধিপত্য হারিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। বিশেষ করে তারল্য সংকটের কারণে কয়েক বছর ধরে পুঁজিবাজারে প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে পারছে না আইসিবি। এ অবস্থায় সরকারের নির্দেশে রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানটিকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।

সম্প্রতি বিএসইসির পক্ষ থেকে আইসিবিকে পুনর্গঠনে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। বিজ্ঞতিতে পরামর্শক নিয়োগের বিষয়ে বলা হয়েছে, দেশের পুঁজিবাজারকে সহায়তা করাই ছিল আইসিবি গঠনের উদ্দেশ্য। কিন্তু কয়েক বছর ধরে, বিশেষ করে ২০১৮-১৯ ও ২০১৯-২০ হিসাব বছরে প্রতিষ্ঠানটি ধারাবাহিক লোকসান দিয়েছে এবং মূলধন হারিয়েছে। উৎপাদন খাত ও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ঋণের অর্থ আদায় করতে না পারায় প্রতিষ্ঠানটির অবস্থা আরো শোচনীয় হয়ে পড়েছে। যদিও এ ধরনের প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেয়াটা কোনোভাবেই পুঁজিবাজারের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। অনেক ক্ষেত্রেই আইসিবি যেসব কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করেছে সেগুলোর পর্ষদে পরিচালক হিসেবে রয়েছে এবং লক-ইন থাকার কারণে প্রতিষ্ঠানটি সেসব কোম্পানির শেয়ারও বিক্রি করতে পারছে না। এতে আইসিবির পোর্টফোলিওর মূল্য উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। আইসিবিকে মূলধন সহায়তা হিসেবে সরকারের পক্ষ থেকে বেশ কয়েকবার ভর্তুকি দেয়া হলেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি।

এতে আরো বলা হয়েছে, আইসিবিকে ভর্তুকি দেয়া সঠিক হবে কিনা, এ মুহূর্তে সরকারকে এটি মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। আর আইসিবির সার্বিক কার্যক্রম বিশ্লেষণ, এ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি ম্যান্ডেট অনুসারে যেসব কাজ করেছে সেগুলোর তালিকা তৈরি, বর্তমানে পুঁজিবাজারে আইসিবির ভূমিকা, প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ও অ-আর্থিক সম্পদের অবস্থা, এর সুশাসন, প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি কাঠামো, জনবল সক্ষমতার পাশাপাশি বিশ্বের অন্যান্য দেশে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রায়োগিকতা বিশ্লেষণের মাধ্যমে সরকারের পক্ষে আইসিবিকে মূল্যায়ন করা সম্ভব বলে মনে করছে বিএসইসি।

পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে আইসিবির বর্তমান ও ঐতিহাসিক আর্থিক এবং অ-আর্থিক পারফরম্যান্স, সার্বিক কার্যক্রম, পুঁজিবাজার উন্নয়নে আইসিবির ভূমিকার পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান হিসেবে আইসিবি যথাযথভাবে তার দায়দায়িত্ব পালন করছে কিনা সেটি পর্যালোচনা করে দেখতে হবে। আইসিবির প্রকৃত ব্যবসায়িক সুযোগ খুঁজে বের করা, বিনিয়োগ কৌশল, পোর্টফোলিওর ঝুঁকি বিশ্লেষণ, পোর্টফোলিও বৈচিত্র্যকরণ, বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া, তহবিলের উৎস ও ব্যবহার এবং আইসিবি ও এর সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি পর্যালোচনা করবে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান। তাছাড়া ঋণ নীতিমালা ও প্রক্রিয়া এবং ঋণ আদায় কার্যক্রমও পর্যালোচনা করবে তারা। সিকিউরিটিজ এবং অন্যান্য আইন ও বিধিবিধান পরিপালন করছে কিনা এবং এক্ষেত্রে কোনো ধরনের বিচ্যুতি রয়েছে কিনা সেটিও পর্যালোচনা করে দেখতে হবে। আইসিবি সম্পর্কে পুঁজিবাজারের স্টেকহোল্ডারদের আবেগ ও প্রত্যাশা এবং প্রতিষ্ঠানটি তা পূরণ করতে পারছে কিনা, সেটি মূল্যায়ন করতে হবে। আইসিবির আর্থিক ও অ-আর্থিক সম্পদ পর্যালোচনা করা এবং এসব সম্পদ যথাযথভাবে ব্যবহার হয়েছে কিনা, সেটি পরীক্ষা করে দেখার পাশাপাশি এর যথাযথ ব্যবহারের বিষয়ে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে সুপারিশ করতে হবে। প্রতিষ্ঠানটির সার্বিক সুশাসন, প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি কাঠামো, জনবল এবং আইসিবি ও এর সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম পরিচালনায় দক্ষতার বিষয়টি পর্যালোচনার পাশাপাশি এসব বিষয়ে কীভাবে উন্নতি করা যায়, সে বিষয়ে পরামর্শককে সুপারিশ করতে হবে। আইসিবিকে তদারকির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএসইসির ভূমিকা পর্যালোচনার পাশাপাশি বিদ্যমান অচলাবস্থা থেকে আইসিবিকে উত্তরণে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো কীভাবে সহায়তা করতে পারে, সেটি খুঁজে দেখবে পরামর্শক। আইসিবি ও এর সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর ধারাবাহিক দুরবস্থার কারণ অনুসন্ধানের পাশাপাশি উত্তরণের উপায় সম্পর্কে পরামর্শ দেবে। আইসিবির পারফরম্যান্স উন্নতির জন্য করণীয় এবং দীর্ঘমেয়াদে পুঁজিবাজারকে সহায়তাসহ মার্কেট মেকার হিসেবে এর ভূমিকার বিষয়ে সুপারিশ করবে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান। সর্বোপরি আইসিবিকে পুনর্গঠনের বিষয়ে সুপারিশের পাশাপাশি এ-সংক্রান্ত বিএসইসির কমিটির নির্দেশনা অনুসারে অন্য যেকোনো ইস্যুতে কাজ করবে পরামর্শক কমিটি।

জানতে চাইলে বিএসইসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াতুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, আমরা সরকারের নির্দেশেই আইসিবিকে পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছি। আমরা চাইছি আইসিবি যাতে পুঁজিবাজারে তার প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে পারে। এজন্য সংস্কারের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির যেসব বিচ্যুতি রয়েছে সেগুলো দূর করা হবে। আইসিবির পুনর্গঠনে পরামর্শক হিসেবে আমরা শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে আবেদন প্রত্যাশা করছি। শীর্ষ পর্যায়ের ছাড়া অন্য কাউকে এ দায়িত্ব দেয়া হবে না বলে জানান তিনি।

পুঁজিবাজারে প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হওয়ায় এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় ও বিএসইসির মধ্যে আলোচনা হয়েছে। সেখানে আইসিবিকে পুনর্গঠনে পরামর্শক নিয়োগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। সরকারের নির্দেশে বিএসইসিকে এ বিষয়ে উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে। তাদের সুপারিশ চূড়ান্তভাবে বাস্তবায়ন করবে অর্থ মন্ত্রণালয়।

এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের যুগ্ম সচিব ড. নাহিদ হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, সরকারের কাছ থেকে নির্দেশনা পাওয়ার পর মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আইসিবিকে পুনর্গঠনে বিএসইসিকে উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সুপারিশ পাওয়ার পর সরকার এগুলো বাস্তবায়ন করবে বলে জানান তিনি।

পরামর্শক প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন তথ্য পর্যালোচনার পাশাপাশি প্রধান স্টেকহোল্ডারদের সাক্ষাত্কার নেবে। আইসিবি পুনর্গঠনসংক্রান্ত বিএসইসির কমিটির কাছে পরামর্শককে প্রেজেন্টেশনসহ দুটি অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। কমিটির মতামত আমলে নেয়াসহ কার্য অনুসন্ধান করে চুক্তি স্বাক্ষরের ৪৫ দিনের মধ্যে পরামর্শককে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। এ বছরের ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে বিএসইসির কাছে পরামর্শক হিসেবে আবেদন করতে হবে।

পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের যোগ্যতার বিষয়ে বলা হয়েছে, ব্যবসায়িক ও আর্থিক বিষয়ে কনসালটেন্সির ক্ষেত্রে তাদের ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। তাছাড়া প্রতিষ্ঠানটি নিজের কিংবা তাদের সঙ্গে অ্যাফিলিয়েশন থাকা প্রতিষ্ঠানের এমএসসিআই ডেভেলপড মার্কেট ইনডেক্স, এসঅ্যান্ডপি ইনডেক্স, ডাওজোনস ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাভারেজ কিংবা এফটিএসই ইনডেক্সে থাকা কোম্পানির সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।

এদিকে আইসিবির সংস্কার ও পুনর্গঠনের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবুল হোসেন বলেন, আমরা আইনানুসারে আমাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে সর্বাত্মক চেষ্টা করেছি। যদি আমরা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হতাম তাহলে এতদিনে বিএসইসি কিংবা স্টক এক্সচেঞ্জের পক্ষ থেকে নিশ্চয় আমাদের নোটিস দেয়া হতো। সংস্কার ও পুনর্গঠনের বিষয়ে আমাদের চিঠির মাধ্যমে অবহিত করা হয়েছে। এ বিষয়ে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে পরিপূর্ণ সহায়তা করা হবে বলে জানান তিনি।

২০১৮-১৯ হিসাব বছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুসারে, আলোচ্য হিসাব বছরে আইসিবির পরিচালন মুনাফা হয়েছে ১৮০ কোটি টাকা, যা এর আগের ২০১৭-১৮ হিসাব বছরে ছিল ৬৬৭ কোটি টাকা। আর ২০১৮-১৯ হিসাব বছরে প্রতিষ্ঠানটির কর পরর্বতী নিট মুনাফা হয়েছে মাত্র ৬০ কোটি টাকা। ২০১৭-১৮ হিসাব বছরে তা ছিল ৪১৬ কোটি টাকা। সর্বশেষ সমাপ্ত ২০১৯-২০ হিসাব বছরের প্রথম তিন প্রান্তিকে (জুলাই-মার্চ) আইসিবির ৪৮ কোটি টাকা কর-পরবর্তী লোকসান হয়েছে, যেখানে এর আগের বছরের একই সময়ে প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা হয়েছিল ৬৯ কোটি টাকা।অনলাইন ডেস্ক

Leave A Reply

Your email address will not be published.