লকডাউনে রাজশাহীতে আমের ব্যবসায় ধস

লকডাউনে রাজশাহীতে আমের ব্যবসায় ধস

6

এক দিকে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের হানা, অন্য দিকে সংক্রমণ রোধে চলমান লকডাউন ও বিধিনিষেধের ধকল। সাথে যোগ হয়েছে আষাঢ়ের বর্ষণ! এ অবস্থায় চলতি মৌসুমের শুরু থেকেই নানা ভোগান্তিতে পড়েছেন আমচাষি ও ব্যবসায়ীরা। সব মিলিয়ে রাজশাহীতে আমের ব্যবসায় এবার ধস নেমেছে। লকডাউনের প্রভাবে রাজশাহীতে অব্যাহতভাবে আমের দাম ও ক্রেতা কমছে। বাজার মন্দা থাকায় চাষি ও ব্যবসায়ীরা এখন আর গাছ থেকে আম পাড়তেই সাহস পাচ্ছেন না। ফলে গাছেই পেকে নষ্ট হতে শুরু করেছে রাজশাহীর সুস্বাদু আম। এতে করে আম ব্যবসায় শেষ পর্যন্ত ক্ষতির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। রাজশাহীর অন্যতম প্রধান অর্থকরী এ ফল বিক্রি করতে না পারলে ব্যাপক লোকসানে পড়বেন চাষি ও ব্যবসায়ীরা।

করোনাভাইরাসের ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণ রোধে রাজশাহী মহানগরীতে গত ১১ জুন থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ‘বিশেষ লকডাউন’ জারি করে জেলা প্রশাসন। পরে দেশজুড়ে কঠোর লকডাউনের ঘোষণা আসার পর রাজশাহীর আমচাষিদের দুশ্চিন্তা বেড়ে যায়। বর্তমানে আমের ভরা মৌসুমের শেষের দিকে। অথচ এখন পর্যন্ত রাজশাহীর বেশির ভাগ চাষি উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ খরচই তুলতে পারেননি। আবার বাগানের ৪০ শতাংশ আমও গাছে থেকে গেছে। ফলে আম ব্যবসা নিয়ে উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছেন চাষি ও ব্যবসায়ীরা।

আমচাষিরা জানান, মৌসুমের শুরু থেকেই বাজার নিম্নমুখী। আমের সরবরাহের তুলনায় ক্রেতা অনেক কম থাকায় বেচাকেনায় ধস নেমেছে। বেশির ভাগ চাষি উৎপাদন খরচ তুলতে পারেননি। অন্য দিকে ৪০ শতাংশ আম এখনো গাছেই থেকে গেছে। বাজারে এখন কিছু আম্রপালি ও ফজলি আম মিলছে। আর কিছু থেকে গেছে গাছেই। আর মৌসুমের শেষ আম আশ্বিনা ও বারি-৪ গাছে রয়েছে পরিপক্বতার অপেক্ষায়। এই অবস্থায় কঠোর লকডাউন তাদের জন্য বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আম ব্যবসায়ীরা জানান, লকডাউনে ক্রেতাসঙ্কটে পড়েছে জেলা ও উপজেলার আম ব্যবসায়ীরা। হাটে আমের সরবরাহের তুলনায় ক্রেতা কম। লকডাউনের কারণে দূরের পাইকাররা আসতে না পারায় আম বিক্রি করতে পারছেন না। এতে আম ব্যবসা নিয়ে তাদের দুশ্চিন্তা বেড়েছে। বিশেষ ব্যবস্থায় বাজার ও আম পরিবহন চালু থাকলেও তাতে খুব বেশি সুবিধা হচ্ছে না। রাজশাহীর বাঘা, চারঘাট, পুঠিয়া, পবাসহ বিভিন্ন উপজেলার আমচাষি ও ব্যবসায়ীদের একই অবস্থা বলে তারা জানান।

রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহীতে চলতি মৌসুমে ৩৭৩ হেক্টর বাড়িয়ে ১৭ হাজার ৯৪৩ হেক্টর জমিতে আম চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এবার উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে হেক্টর-প্রতি ১১ দশমিক ৯ মেট্রিক টন। মোট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা দুই লাখ ১৯ হাজার মেট্রিক টন। রাজশাহী জেলা প্রশাসনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, গত ১৫ মে থেকে গুটি আম নামানো শুরু করেন চাষিরা। উন্নতজাতের মধ্যে গোপালভোগ ২০ মে, রানীপছন্দ ২৫ মে ও খিরসাপাত (হিমসাগর) ১ জুন থেকে নামানো শুরু হয়। জুনের শেষের দিকে ল্যাংড়া, আম্রপালি ও ফজলি নামানো শুরু হয়। আগামী ১৭ জুলাই থেকে নামানো শুরু হবে মৌসুমের শেষ আম আশ্বিনা ও বারি-৪।

রাজশাহীর সবচেয়ে বড় আমের হাট জেলার পুঠিয়া উপজেলার বানেশ্বরে চারঘাটের আমচাষি ও ব্যবসায়ী আজমল হোসেন জানান, বাজারে মানুষের ভিড় থাকলেও ক্রেতা অনেক কম। বর্তমানে আমের দোকান বসাতে দিচ্ছে না পুলিশ। ব্যবসা প্রায় বন্ধের মতো অবস্থা। তিনি জানান, বাগানে এখনো অনেক আম আছে। কিন্তু অন্যান্য জেলার ব্যবসায়ীরা কম আসায় এবার আমের ব্যবসায় মন্দা।

রাজশাহীর পবা উপজেলার হরিয়ানের আমচাষি নুরুল ইসলাম জানান, এরই মধ্যে গোপালভোগ ও হিমসাগর আমে লক্ষাধিক টাকার লোকসান হয়েছে। ফজলি আম প্রতি মণ মাত্র ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বাগানে কিছু গাছে এখনো ফজলি ও আশ্বিনা আম রয়েছে। সেগুলো বিক্রি নিয়ে একটু চিন্তায় আছি।
রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার ভালুকগাছীর আমচাষি হোসেন আলী জানান, আমার ১০ বিঘা জমিতে আমের বাগান রয়েছে। আমের ফলনও ভালো হয়েছে। কিন্তু ক্রেতাসঙ্কটে আশানুরূপ দাম পাচ্ছি না। তিনি বলেন, লকডাউনে দাম কমে যাওয়ায় আম বিক্রির যে টাকা আশা করেছিলেন তা পূরণ হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। এখনো চার বিঘা বাগানের আম গাছে রয়েছে।রাজশাহী ব্যুরো

Comments are closed.

%d bloggers like this: