শিশুর প্রতি কোনোরকম শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের অধিকার নেই

53

অনেক মা-বাবা, অভিভাবক ও শিক্ষক-শিক্ষিকা ছোট ছোট শিশুদের শাসনের নামে বেদম প্রহার করে থাকেন বা শারীরিক নির্যাতন করে থাকেন। প্রশ্ন হলো, পড়াশোনা না করার অজুহাতে অথবা পড়াশোনার প্রতি অমনোযোগী হওয়ার কারণে অথবা দুষ্টামি করার কারণে শিশুদের প্রহার করার বিধান কি

শুরুতেই যে কথাটি বলা দরকার তা হলো- একজন মানুষ যতক্ষণ পর্যন্ত ইসলামী শরিয়ার নিয়মানুযায়ী বালেগ না হয় বা নাবালেগ থাকে, ততক্ষণ সে শরিয়তের দৃষ্টিতে শিশু হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। আর শিশুর প্রতি মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তায়ালার কোনো আদেশ-নিষেধ কার্যকর নয় বা বর্তায় না। শিশুর ওপর কোনো আবশ্যিক বিধিবিধান অথবা শাস্তিমূলক বা কোনো দণ্ডবিধি প্রযোজ্য হয় না। এ ব্যাপারে সারা বিশ্বের সব ওলামায়ে কেরাম একমত। যেখানে নাবালেগ সৃষ্টির প্রতি মহান সৃষ্টিকর্তার এমন দৃষ্টিভঙ্গি সেখানে কোনো মা-বাবা, অভিভাবক, শিক্ষক বা অন্য যে

কারো কোনো শিশুর প্রতি কোনোরকম শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের অধিকার নেই।

এ কারণে শিশুদের জন্য ইসলাম শাস্তিমূলক ব্যবস্থার পরিবর্তে তাদিব বা শৃঙ্খলা শেখানোর কথা বলে, শিষ্টাচার শেখানোর কথা বলে এবং প্রশিক্ষণ দেয়ার কথা বলে। শিশুদের বয়স অনুপাতে ইসলামী শরিয়ার শাসন নীতিমালা অবলম্বনে তাদের শাসন করার নাম তাদিব বা আদব শিক্ষা দেয়া। সুতরাং শিশুদের তাদিব বা শৃঙ্খলা প্রশিক্ষণ দেয়ার হুকুম থাকলেও শিশুর জন্য শাস্তিমূলক কোনোরকম ব্যবস্থা গ্রহণ ইসলামে জায়েজ নেই।

বিশেষ করে একজন শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের সাথে কেমন দৃষ্টিভঙ্গি বা আচরণ হওয়া উচিত সে বিষয়ে আমরা নির্দেশনা পাই সূরা আর-রাহমানের প্রথম আয়াতগুলোতে। এখানে আল্লাহ বলেছেন, ‘যিনি পরম দয়ালু তিনি মানবজাতিকে কুরআন শিক্ষা দিয়েছেন।’ এখানে আল্লাহ মানবজাতির কুরআনের শিক্ষায় তিনি নিজেই শিক্ষক হিসেবে অবতীর্ণ হয়েছেন। আর আল্লøাহ যখন শিক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন তখন তার যে গুণটি উল্লেøখ করেছেন তা হলো- ‘আর রহমান’ যার অর্থ অনেক দয়ালু এবং পরম মায়াময়। অথচ শিক্ষার সাথে আল্লাহর গুণবাচক নাম ‘আলিম’ বা ‘আল্লাম’ (অনেক জ্ঞানী) বেশি যথার্থ হতে পারত। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা এখানে ‘আর রহমান’ তথা পরম দয়ালু উল্লেøখ করে আমাদের বার্তা দিয়েছেন যে, যারা শিক্ষক হবেন বিশেষ করে কুরআনের শিক্ষক তাদের অন্তরভরা মায়া থাকতে হবে, দয়া থাকতে হবে। যেমনটি মহান রব তার নিজের ক্ষেত্রে উল্লেখ করেছেন।

অতএব একজন কুরআনের শিক্ষক তার শিক্ষার্থীকে বেদমভাবে প্রহার করতে পারেন না বা অমানবিক আচরণ করতে পারেন না। যদি করে থাকেন তাহলে অবশ্যই তিনি কুরআনের শিক্ষক হওয়ার যোগ্য নন, বরং তিনি এক প্রকার জল্লাদ।

আবু দাউদ শরিফের একটি হাদিসে আছে- রাসূলে করিম সা: বলেছেন, ‘তোমাদের সন্তানদের সাত বছর বয়সে সালাতের নির্দেশ করো। আর তারা যখন ১০ বছরে উপনীত হয় তখনো যদি সালাত আদায় না করে তাহলে শাসনমূলক প্রহারের ব্যবস্থা গ্রহণ করো।’ সেই প্রহার হবে একান্তই শাসনের উদ্দেশ্যে এবং শাসনের পদ্ধতিতে। আজকাল শাসনের নামে আমরা যে অমানবিক ও বেদম মারধর এবং আচরণ দেখতে পাই সেটা মোটেও শাসন নয়, বরং এটি চরমভাবে নাজায়েজ। এই হাদিসে মোটেই এরকম মারধরের কথা বলা হয়নি।

ইমামে আজম আবু হানিফা, ইমাম মালেক ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ:সহ সব স্কলার তথা সংখ্যাগরিষ্ঠ স্কলার এ হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেছেন, ‘সালাত আদায় না করার জন্য ১০ বছরের শিশুকে সর্বোচ্চ তিনটি মৃদু আঘাত করা যেতে পারে। তবে সেটি যেন শাস্তিমূলক পর্যায়ে না হয়; একান্তই শাসনমূলক হয়। তাকে সালাতের গুরুত্ব বোঝানোর জন্য এই শাসনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। অবশ্যই শিশুকে এমন শাসন বা প্রহার করা যাবে না যাতে শিশুর শরীরে কোনো দাগ হয় বা বেশি ব্যথা পেয়ে যায়। একইভাবে শিশুর মনে ব্যথা দিয়েও শাসন করা যাবে না।

সালাতের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিধান একজন ্ঈমানদারের জন্য হতে পারে না। সুতরাং সালাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিধান লঙ্ঘন করার কারণে শাসন করতে গিয়ে যদি এতটা দায়িত্বশীল হতে হয় বা হাদিসে বর্ণিত শাসনের পদ্ধতি অনুসারে শাসন করতে হয় তাহলে একজন শিশুকে পড়াশোনা না করা বা অমনোযোগী হওয়া অথবা দুষ্টামি করার অজুহাতে তাকে প্রহার করার কোনো সুযোগ ইসলামী শরিয়তে নেই।

ইসলামের পঞ্চম খলিফা খ্যাত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ রহ:-এর শাসনামলে বিভিন্ন অঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্তদের উদ্দেশে একটি চিঠি তিনি লিখেছিলেন। তাতে তিনি নির্দেশ দিয়েছেন, কোনো শিক্ষক যেন কোনো শিক্ষার্থীকে তিনটির বেশি আঘাত (মৃদু) না করে। আর অবশ্যই তা হতে হবে শাসনের জন্য রাগের বশে নয় বা ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে নয়। শিক্ষার্থীকে সতর্ক করার জন্য কিছুটা ভয় দেখানোর জন্য এ শাসন। শিক্ষার্থীকে শাস্তি বা কষ্ট দেয়ার জন্য আঘাত করা যাবে না। ব্যক্তিগত আক্রোশ বা রাগ থেকে শিশু, শিশুশিক্ষার্থী বা যেকোনো বয়সের শিক্ষার্থীকে আঘাত করলে অবশ্যই কিয়ামতের ময়দানে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।

বিশিষ্ট তাবেয়ি ইমাম দাহাক রহ: বলেছেন, কোনো শিক্ষক যদি ছাত্রকে তিনটির বেশি আঘাত করেন বা এমনভাবে মারধর করেন যা নির্যাতনের পর্যায়ে চলে যায় বা বেদম প্রহারের পর্যায়ে চলে যায় তাহলে সেই শিক্ষককে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে এবং তার কাছ থেকে কিসাস তথা অনুরূপ শাস্তি ওই শিক্ষককে দিতে হবে।

শিক্ষার্থীদের শাসনের ক্ষেত্রে এই হলো ইসলামের একেবারে প্রথম সারির মনীষীদের দৃষ্টিভঙ্গি। উপরোক্ত দৃষ্টিভঙ্গিগুলো একত্র করলে আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সেটি স্কুল হোক, মাদরাসা হোক অথবা হেফজখানা হোক, যদি শিশুদের বা শিক্ষার্থীদের বেদম প্রহার করা হয় তাহলে সেটি সম্পূর্ণ নাজায়েজ এবং গুনাহের একটি কাজ হিসেবে বিবেচিত।

হেফজখানাগুলোতে শিশুদের প্রতি বেদম প্রহারের যে ঘটনাগুলো আমরা জেনে থাকি তা খুবই উদ্বেগের বিষয়, চিন্তার বিষয়। যদিও সব হেফজখানায় সবসময় এ রকম ঘটছে বিষয়টি এমন নয়। কিন্তু উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ঘটছে এটা সত্য। বিশেষজ্ঞ এবং সিনিয়র ওলামায়ে কেরামের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে এগুলো নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগী হওয়া।

এ বিষয়ে আমার ক্ষুদ্র অভিমত হলো- যেহেতু হেফজখানাগুলোতে এ রকম ঘটনা বেশি ঘটছে। তাই দেশের শীর্ষস্থানীয় ওলামায়ে কেরামদের নিয়ে গঠিত ঐক্যবদ্ধ কোনো প্লাটফর্ম থেকে দেশের হেফজখানাগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকার তথা প্রশাসনের সহায়তা নেয়ার প্রয়োজন দেখা দিতে পারে।

প্রথমেই সব হেফজখানাকে বাধ্য করতে হবে যে, কোনো হেফজখানায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক ছাড়া কোনো শিক্ষক নিয়োগ দেয়া যাবে না। আর প্রত্যেক শিক্ষককে গঠিত প্লাটফর্মের কাছে প্রশিক্ষণ নিতে হবে। প্রশিক্ষণ নেয়ার পরও যদি কোনো শিক্ষক কোনো শিক্ষার্থীর প্রতি নির্যাতনমূলক আচরণ বা বেদম প্রহার করে থাকেন তাহলে ওই শিক্ষককে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। আর যদি কর্তৃপক্ষ তথা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটির গাফিলতি থাকে তাহলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে ওই প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করে দিতে হবে। তাহলে ইনশাআল্লাহ এই অনাচারের পথ রুদ্ধ হবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের সবাইকে সব ধরনের নির্যাতন, নিপীড়ন এবং অনাচার থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : চেয়ারম্যান, আস সুন্নাহ ফাউন্ডেশন

Comments are closed.

%d bloggers like this: