সপ্ন , গাজী জান্নাতুল ফেরদৌস অন্যন্যা

সপ্ন , গাজী জান্নাতুল ফেরদৌস অন্যন্যা

46

আমার জীবনে প্রথম লেখা বইটি ১৬ বছর বয়সে ছাপানো হয়েছে। বইটি ছাপানোর পর বেশ লজ্জায় পড়ে গিয়েছিলাম। আমার বইটি পড়ে সবাই কিভাববে তা ভেবে মুসকি মুসকি হেসে দুহাত দিয়ে মুখ ডেকে ফেলতাম। বইটি মূলত উৎসর্গ করেছিলাম আমার সবচাইতে প্রিয় শিক্ষকের নামে। এ নিয়ে আমার পরিবারের কেউ আক্ষেপ প্রকাশ করেনি। তবে ছোট বোনটি বেশ কষ্ট পেয়েছে। তার ধারণা ছিল তার নামে বইটি উৎসর্গ করব তবে তার আশা ভঙ্গ হয়েছে।

একদিন কাউকে কিছু না জানিয়ে বইটি নিয়ে স্যার এর বাসার দিকে রওনা হলাম। হাঁটতে হাঁটতে এক সময় পৌঁছে গেলাম। চিন্তা করতে লাগলাম যার নামে বইটি উৎসর্গ করলাম সেই বইটি পড়বে না তা কখনও হয়? স্যার এর বাসার সামনে আসতেই দেখি স্যার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি আমাকে সম্ভবত দেখতে পাননি তাই তার ভাবের কোনো পরিবর্তন হয়নি। তার সামনে দাড়িয়ে খুব হালকা ভাবে স্যারকে সালাম দিলাম স্যার আস্সালামু আলাইকুম

স্যার আমার সালাম শুনে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে সালামের জবাব দিলেন। অতপর আমাকে বললেন কিরে নিলু এ অবেলা এখানে কী করছিস? স্যার এর দিকে বইটি এগিয়ে দিয়ে বললাম স্যার এটা আপনার জন্য। স্যার বইটি হাতে নিয়ে এদিক সেদিক দেখতে লাগলেন। অতপর তিনি আমার দিকে ভ্রু-কুচকে তাকালেন। তিনি বললেন বইটি তুই লিখেছিস?

জ্বী স্যার।

এবং আমার নামে উৎসর্গ ও করেছিস?

জ্বী স্যার।

আমাকে উৎসর্গ করার আগে জিজ্ঞেস করা উচিত ছিল।

কেন স্যার?

তুই একটুও ভালো গল্প লিখিস না। অকারনে আমার নামে উৎসর্গ করেছিস।

স্যার এর কথা শুনে দু-চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। আমি চোখের জল মুছে বললাম স্যার সত্যিই কি আমি আমি ভালো লিখিনি? স্যার এককথায় বলে দিলেন, না। তাহলে এখন আমি কী করব?

কিছু করার নেই।

বইটি কি আমি ফেরত নিয়ে যাব স্যার?

দিয়েছিস যখন থাকুক না।

আচ্ছা স্যার, এখন আসি তাহলে। ¯আস্-মুয়ালাইকুম।

দাঁড়া।

স্যার এর কথা শুনে দাঁড়িয়ে পড়লাম। অতপর বললাম কিছু বলবেন স্যার?

স্যার পান মুখে ঢুকিয়ে চিবুতে চিবুতে বললেন তোর গল্পটা খারাপ তবে গল্পের শেষ লাইনটা ভালো ছিল। কথা বলার কারনে স্যার এর মুখ থেকে থু থু বের হচ্ছে। তবুও স্যার এর একটু কাছে এসে বললাম সত্যি স্যার? আমার বিশ্বাসই হচ্ছে না। আমার চোখ চকচক করছে দেখে স্যার বললেন শেষের লাইনটি ভালো ছিল। দেখ আমার মুখস্ত হয়েগেছে। শোন তাহলে-

নদী নৌকায়া পাড়াপাড় হচ্ছিলাম হঠাৎ দেখি নদীতে বড়সড় ঢেউ উঠল। ওমা! আগে তো এমন ঢেউ দেখিনি। তৎক্ষনাৎ একটি বিকট আওয়াজ শুনতেই পাশে তাকালম দেখি বড় একটি জাহজ যাচ্ছে। আমি চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে জাহাজটি দেখছি। এক সময় জাহজটি দূরে চলে গেল। তখন নদীর দিকে তাকিয়ে দেখি আগের সে ঢেউ নেই। যাহ! আমার চিন্তাটিহ বুঝি বৃথা।

কথা গুলো স্যার অনবরত বলেই গেলেন। থামলেননা একটি বারের জন্যও। যদিও স্যার বেশীর ভাগই ভুল বলেছেন। শেষ লাইনটি বলবেন বলেছিলেন, অথচ তিনি কতগুলো লাইন বলেগেলেন, স্যার এর প্রতি কৃতজ্ঞে চোখে আবারও জল এসে গেল। হঠাৎ স্যার বলে উঠলেন কিরে ঠিক বলেছি না? আমি বললাম জ জ্বী স্যার। এবার বাড়ি যা কানের সামনে ভ্যান ভ্যান না করে, স্যার বলে উঠলেন। স্যার যতই যা বলুক না কেন এখন আর মন খারাপ হবে না। স্যারকে শেষ বারের মতো সালাম দিয়ে চলে আসলাম।

রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে একটি কথা মাথায় আসল। স্যার শুধু চোখ বুলিয়ে এপিঠ-ওপিঠ দেখে এতগুলো বাক্য কিভাবে বললেন? সে কী আগেও পড়েছেন বইটি? স্যারকে কথাটি জিজ্ঞেস করতে হবে। পরে যখন আসব তখন স্যারকে কথাটি জিজ্ঞেস করব। হঠাৎ আমি বিছানা ছেড়ে ধড়মড় করে উঠে পড়লাম। জানালা দিয়ে বৃষ্টির পানির ছিটে এসে মুখে লাগছে। বিছানা থেকে নেমে জানালাটি লাগিয়ে দিলাম। অতপর টেবিলের ওপর চোখ পড়তেই দেখি বৃষ্টির পানি এসে আমার ডায়েরিটি ভিজে গিয়েছে।

গল্পের ডায়েরিটি হাতে নিয়ে ওড়না দিয়ে ভালো করে মুছে এর এপিঠ আনমনা হয়ে দেখতে লাগলাম একটি দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে ডায়েরিটি টেবিলে রেখে দিলাম।

আমি আস্তে আস্তে হেঁটে জানালার সামনে এসে দাঁড়ালাম। চিন্তা করতে লাগলাম সত্তি! আজকের সপ্নটি খুব অদ্ভুত ছিল। আমরা বাস্তবে বা সপ্নে যেভাবেই হোক না কেন আমি তা অনুভব করতে চাইবো বারেবার শতবার। হঠাৎ রুংকি পিছন থেকে ডেকে উঠল আমি কিছুটা চমকে যাই। নিজেকে সামলে আমি পিছন ফিরে তাকাই। আমি পিছন ফিরে তাকাতেই রুংকি বলে উঠল আপা জানেন কী হয়েছে? আমি বললাম কী?

আপা আপনার বই ছাপানো হয়েছে তাও প্রথম বার। রুংকি বলে উঠল।

তার কথা শুনে চোখ ঝাপসা হয়ে এলো প্রচন্ড খুশিতে যেনো আত্মহারা হয়ে উঠেছিলাম। শুধু শুধু কেন বোকা বানাচ্ছিস। রুংকি কিছুটা মুচকি হেসে বলল আপা শুধু শুধু আপনাকে কেন বোকা বানাবো। রুংকি তার হাতে থাকা একটি বই আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল এইযে, আপা আপনার গল্পের বই। কাপা কাপা হাতে বইটি রুংকির থেকে বইট নিলাম। সত্যিই বইটি আমার। এইতো আমার গল্পটিইতো বইটির মধ্যে বইটির ওপরে আমার নাম লিখা আছে। খুশিতে চোখে জল এসে গেল। ঠিক তৎক্ষনাৎ’ নিজেকে সামলে নিলাম। ভাবতে লাগলাম হয়তো আমি সপ্ন দেখছি আবারত্ত। হঠাৎ করেই জেগে উঠবো অতপর এ সপ্নের জগৎ সব মিথ্যে হয়ে যাবে।

Comments are closed.

%d bloggers like this: