সবার অংশগ্রহণমূলক সরকার হতে যাচ্ছে আফগানিস্তানে

সবার অংশগ্রহণমূলক সরকার হতে যাচ্ছে আফগানিস্তানে

0

অনলাইন ডেস্ক:  আফগানিস্তানের রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করতে রাজধানী কাবুল ফিরেছেন তালেবানের সিনিয়র নেতা আমির খান মুত্তাকি। সাবেক প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই, আবদুল্লাহ আবদুল্লাহসহ রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে তার আলোচনা করার কথা। এর মধ্যে আবদুল্লাহ আবদুল্লাহ এক সময় দেশটির সমঝোতা বিষয়ক পরিষদের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। একটি সূত্র বলেছেন, আফগানিস্তানে হতে যাচ্ছে সবার অংশগ্রহণমূলক সরকার। তালেবান নন, এমন রাজনৈতিক নেতাদেরকেও এই সরকারে ঠাঁই দেয়া হবে। তালেবানরা দেশ দখল করেছে দু’দিন হলো। কিন্তু এখনও সরকার গঠন না হওয়ার নেপথ্য কারণ হলো এটা। বার্তা সংস্থা এপি’কে উদ্ধৃত করে এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল জাজিরা।

আলোচনার বিষয়ে ভালভাবে জানেন এমন একজন কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করেছে এপি। রিপোর্টে বলা হয়েছে, সর্বশেষ যখন দেশ শাসন করেছে তালেবানরা, সে সময়ে উচ্চ শিক্ষা বিষয়ক মন্ত্রী ছিলেন আমির খান মুত্তাকি। সপ্তাহান্তে অতি গোপনে প্রেসিডেন্ট আশরাফ গণি পালিয়ে দেশ ছাড়ার আগে থেকেই আফগানিস্তানের রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেছেন আমির খান মুত্তাকি। তিনি তাদের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করেছেন। ওই সূত্রটি বলেছেন, এই আলোচনার উদ্দেশ্য আছে। তা হলো আফগানিস্তানে তালেবান নন, এমন নেতাদেরকে সরকারে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। কাতারে অবস্থানরত তালেবান মুখপাত্র সুহেইল শাহিন এমন সরকারকে সবার অংশগ্রহণমূলক সরকার বলে অভিহিত করেছেন। এসব আলোচনা সম্পর্কে জানেন এমন আফগানরা বলছেন, গত রাতেও বেশ কয়েক দফা আলোচনা হয়েছে। আশরাফ গণি দেশ ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই আলোচনা শুরু হয়েছে।
সরকারি কর্মীদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে তালেবানের বিবৃতি: আফগানিস্তানের রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছে তালেবান।এরপর থেকে দেশটির প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে পড়েছে। সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে কর্মীরা যাচ্ছেন না। এ ছাড়া থানাগুলো থেকে পালিয়েছে পুলিশ।এমন পরিস্থিতিতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজে ফেরাতে তাদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছে তালেবান। এ ছাড়া তাদের কাজে ফেরার আহ্বান জানিয়েছে তারা। সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের উদ্দেশে তালেবান একটি বিবৃতি দিয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, ‘আপনাদের উচিত, পূর্ণ বিশ্বাস নিয়ে নিয়মিত জীবনে ফিরে আসা।’
এর আগে রোববার আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলের নিয়ন্ত্রণ নেয় তালেবান। তালেবানের সশস্ত্র সদস্যরা কাবুলে ঢোকার আগেই দেশটির প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। এরপর থেকে প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে পড়ে। এ ছাড়া তালেবান পুরো শহরের নিয়ন্ত্রণ নিলে সেখানকার বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়তে থাকে। অনেকে শহর ছেড়ে পালানোর চেষ্টা করে। আবার অনেকে দেশ ছাড়তে সীমান্তে ও বিমানবন্দরে অবস্থান নেয়। এরই মধ্যে মার্কিন বিমানে তাহাহুড়ো করে উঠতে গিয়ে পাঁচজন মারা গেছেন। যদিও কাবুলের বিমানবন্দর যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর হাতে। কিন্তু উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা কমছে মার্কিনিদের সাহায্য করা আফগানদের। বিমানবন্দর থেকে তাড়াহুড়ো করে মার্কিন বিমানে অনেকে উঠতে না পেরে কেউ কেউ বিমানের চাকায় কক্ষে আশ্রয় নিয়েছেন। তবে মাঝ আকাশ থেকে নিহতদের লাশ পড়তে দেখা গেছে। আফগান পরিস্থিতি : কী ভূমিকা নিচ্ছে তুরস্ক? বিবিসি’র এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,তালেবান আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার পর ওই দেশটির পরবর্তী সংকট নিরসের বিষয়ে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার হয়েছে। এ ব্যাপারে তৎপরতা চালাচ্ছে তুরস্কও। তুরস্ক বলেছে, আফগান সংঘাতে সংশ্লিষ্ট ‘সব পক্ষের’ সাথে তারা কথা বলছে, যার মধ্যে তালেবানও রয়েছে। জর্ডানের রাজধানী আম্মানে এক সংবাদ সম্মেলনে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুৎ কাভুসগলু বলেন, আফগানিস্তানে কূটনৈতিক মিশন এবং সেখানে তুরস্কের নাগরিকদের ব্যাপারে তালেবানের বার্তাকে তুরস্ক স্বাগত জানিয়েছে। ‘আমরা আশা করছি তারা যা বলেছে তা কাজেও করবে,’ বলেন তিনি। তিনি আরো বলেন, আফগানিস্তানের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, স্থিতিশীলতা এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার কাজে সহায়তা অব্যাহত রাখবে তুরস্ক।
তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তুরস্ক এই মুহূর্তে আফগানিস্তান থেকে তাদের এবং অন্যান্য দেশের নাগরিকদের সরিয়ে নেয়ার কাজ করছে। এর আগে, তুরস্ক বলেছিল, ন্যাটো বাহিনীর সদস্যরা আফগানিস্তান ছেড়ে যাবার পর সেদেশের বিমানবন্দরের প্রহরা ও কার্যক্রম চালু রাখতে তাদের ৬০০ সৈন্য আফগানিস্তানে থেকে যাবে। কিন্তু এখন তালেবান ক্ষমতা হাতে নেয়ার পর সেটা হবে কিনা তা স্পষ্ট নয়। তবে নাম প্রকাশ না করে দুটি সূত্র থেকে সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে জানানো হয়েছে, এই পরিকল্পনা এখন বাতিল হয়ে গেছে। কিন্তু তালেবান সহায়তা চাইলে তুরস্ক সেটা দিতে প্রস্তুত আছে বলে জানিয়েছে। এদিকে, আফগানিস্তানের প্রতিবেশী দেশ ইরান জানাচ্ছে কাবুলে তাদের দূতাবাস এখনো খোলা আছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, আফগানিস্তানে তাদের দূতাবাস ‘সম্পূর্ণ খোলা এবং পুরো মাত্রায় কাজ করছে’। আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা আইএসএনএ-কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র সাঈদ খাতিবজাদে এর আগে সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত এই খবর নাকচ করে দেন যে আফগানিস্তানে শুধু রাশিয়া, চীন ও পাকিস্তানের দূতাবাস খোলা রয়েছে। তিনি আরো বলেন, শুধু কাবুলেই নয়, হেরাতেও ইরানি কনস্যুলেট ‘পুরোপুরি কাজ করছে’। সপ্তাহান্তে ইরান জানিয়েছিল, আফগানিস্তানে তাদের পাঁচটির মধ্যে তিনটি কনস্যুলেট তারা গোপনে বন্ধ করে দিয়েছিল এবং সেখানকার কূটনীতিকদের কাবুলে নিয়ে গিয়েছিল। কিছু কূটনীতিককে তারা তেহরানে ফেরত নিয়ে গেছে।
তালেবানের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করছে কারা?
যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক পশ্চিমা দেশ কাবুলে তাদের দূতাবাস বন্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ এখনো তালেবানের সাথে সম্পর্কের রাস্তা খোলা রেখেছে। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেছেন আফগানিস্তানের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরিতে চীন আগ্রহী। তালেবান বার বার বলেছে, তারা চীনের সাথে সুসম্পর্ক চায়। আফগানিস্তানের পুনর্গঠন এবং উন্নয়নে তারা চীনের অংশগ্রহণ চায়। অমরা তাদের ইচ্ছাকে স্বাগত জানাই। রুশ দূতাবাসের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনার জন্য আফগানিস্তানে রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত দিমিত্রি জিরমভ মঙ্গলবার তালেবান প্রতিনিধিদের সাথে বৈঠক করবেন। রুশ সরকার বলেছে তারা তালেবানের সাথে সম্পর্ক তৈরি করতে চায়, কিন্তু তাদেরকে আফগানিস্তানের শাসক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে তাড়াহুড়ো করতে চায় না। ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি বলেছেন, আফগানিস্তানে মার্কিন সামরিক ব্যর্থতার ফলে সেদেশে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি স্থাপনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন রাইসিকে উদ্ধৃত করে বলেছে, ‘আফগানিস্তানে আমেরিকার সামরিক পরাজয় এবং প্রস্থানকে আফগানিস্তানের নিরাপত্তা এবং শান্তির জন্য একটি সুযোগ হিসাবে ব্যবহার করতে হবে।’ পাকিস্তান আফগান পরিস্থিতি নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া দেয়নি, তবে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বলেছেন, ‘আফগানরা দাসত্বের শৃঙ্খল ভেঙ্গেছে।’এই চারটি দেশ কাবুলে তাদের দূতাবাস বন্ধ করেনি, যদিও ইরান তাদের বেশ কয়জন কূটনীতিককে দেশে নিয়ে গেছে। ভবিষ্যতে আফগানিস্তানে একটি তালেবান সরকারকে যে এই চারটি দেশ মেনে নেবে তার ইঙ্গিত স্পষ্ট। সূত্র : বিবিসি

Comments are closed.

%d bloggers like this: