হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের

25

পবিত্র কোরআনুল কারীমে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালা এরশাদ ফরমান, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের ওপর।’ (সুরা বাকারা, আয়াত-১৮৪) এতে বুঝা গেল, রোজা কেবল আমাদের জন্যই ফরজ করা হয়েছে এমন না; বরং আমাদের পূর্ববর্তী নবী ও রাসুলগণের উম্মাতের জন্যও ফরজ ছিল। তবে আমাদের জন্য এই মাস বিশেষ একটি মাস। কারণ, এই মাসে রবের তরফ থেকে আমাদের বিধান (আল-কোরআন) নাজিল হয়েছে। যারা রমজান মাসে দিনের বেলায় নিজেকে খানাপিনা, সহবাস থেকে নিজেকে বিরত রেখে রোজা রাখে শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, তাঁদের জন্য রয়েছে দশটি সুসংবাদ! হ্যাঁ, দশটি সুসংবাদ!

১. রোজা তাকওয়া অর্জনের শ্রেষ্ঠ উপায়। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালা সুরা বাকারার ১৮৪ নং আয়াতে বর্ণনা করেছেন। আমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যাতে আমরা তাক্বওয়া অর্জন করতে পারি। এতে বুঝা গেল, রোজা তাকওয়া অর্জনের অন্যতম মাধ্যম। তাক্বওয়া মুমিনের জন্য অতি গুরত্বপূর্ণ একটি বিষয়। তাকওয়া দুনিয়া ও আখেরাতের মূল সাফল্যের চাবিকাঠি! ২. রোজা, পূর্বের গুনাহ মুছে ফেলে। প্রত্যেক আদম সন্তান গোনাহগার। আর আল্লাহতায়ালাও চান যে, আদম সন্তান গোনাহ করে আল্লাহর দরবারে তাওবাহ করুক। কারণ, যদি বনী আদম গোনাহ না করত, তাহলে আরেকটি জাতি সৃষ্টি করতো; যে গোনাহ করবে এবং ক্ষমা প্রার্থনা করবে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও নেকীর আশায় রমজান মাসের সাওম রাখে (এবং রাতে) দণ্ডায়মান হয় (সালাত পড়ে) তার পূর্ববর্তী গুনাহ মাফ করা হয়।’ (সহিহুল বুখারি-৩৮) সুবহানাল্লাহ! রোজাদারের জন্য এরচেয়ে বড় খুশির সংবাদ আর কী হতে পারে!

৩. রোজার প্রতিদান আল্লাহ নিজেই দেবেন। বনী আদমের পুণ্য কাজের বদলা ফেরেশতাদের মাধ্যমে দেন। কিন্তু, রোজাদারের বদলা আল্লাহ নিজেই দেবেন। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, মহান আল্লাহ বলেন, ‘আদম সন্তানের প্রতিটি সৎকর্ম তার জন্যই; কিন্তু রোজা স্বতন্ত্র, তা আমারই জন্য! আর আমিই এর প্রতিদান দেব!’ (সহিহুল বুখারি-১৯০৪) ৪. রোজা, কিয়ামতের দিন সুপারিশ করবে। হদিসে বর্ণিত আছে, কিয়ামতের দিন সাওম ও কোরআন সুপারিশ করবে। সিয়াম বলবে, ‘হে আমার রব! আমি তাঁকে দিনে খানাপিনা ও জৈবিক চাহিদা থেকে বিরত রেখেছি। আপনি তাঁর ব্যপারে আমার সুপারিশ কবুল করুন।’  কোরআন বলবে, হে আমার রব! আমি তাঁকে রাতে ঘুমুতে দিইনি। আপনি তাঁর ব্যাপারে আমার সুপারিশ কবুল করুন! সিয়াম ও কোরআন উভয়ের সুপারিশ কবুল করা হবে।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং-৬৬২৬) ৫. রোজা, জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেয়। হাদিস শরীফে এসেছে ‘যে-ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে গিয়ে রোজা রাখবে, আল্লাহতায়ালা তাঁকে সত্তর বছরের দূরত্বে নিয়ে যান!’ (সহিহুল বুখারি – ২৮৪০) ৬. রোজার সমকক্ষ কোনো আমল নেই। আবু উমামা (রা.) বলেন, আমি একবার হুজুরপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলাম, হে আল্লাহর রাসুল! সবচেয়ে উত্তম আমল কী? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তুমি সাওমকে আঁকড়ে ধরো! কেননা, সাওমের সমকক্ষ কিছুই নেই! (নাসাঈ, হাদিস নং-২২২২) ৭. রোজাদারের দোয়া কখনো ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। হাদিসে এসেছে, হুজুরেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘তিন ব্যক্তির দোয়া কখনো ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। পিতার দোয়া, রোজাদারের দোয়া ও মুসাফিরের দোয়া।’ (আস-সুনানুল কুবরা লিল বাইহাকি, হাদিস নং-৬৩৯২) ৮. জান্নাতে রোজাদারের জন্য রয়েছে বিশেষ দরজা। যেই দরজা দিয়ে শুধুমাত্র রোজাদারেরা ব্যতীত কেউ প্রবেশ করতে পারবে না। হাদিসে এসেছে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ ফরমান, জান্নাতে রায়য়্যান নামক একটি ফটক আছে। কিয়ামতের দিন রোজাদারেরা এই ফটক দিয়ে প্রবেশ করবে। রোজাদার ব্যতীত কেউ এই ফটক দিয়ে প্রবেশ করত পারবে না।’ (সহিহুল বুখারি, হাদিস নং-১৮৯৬)

৯. রোজাদার জান্নাতে বিশেষ মর্যাদা লাভ করবে। হাদিসে এসেছে, ‘জান্নাতে একটি প্রাসাদ আছে। যেই প্রাসাদের ভেতর থেকে বাইরে, বাইর থেকে ভেতরে দেখা যাবে। এই প্রাসাদটি আল্লাহতায়ালা সেই সব ব্যক্তির জন্য প্রস্তুত করেছেন, যারা মানুষকে আহার করায়, নম্র ভাষায় কথা বলে, নিয়মিত রোজা রাখে এবং তাহাজ্জুদ আদায় করে।’ ১০. রোজা জৈবিক তাড়নাকে দমন করে। আমরা সবাই মানুষ। আমাদের জৈবিক চাহিদা থাকতেই পারে। তবে, সেটা মেটাতে হবে শরিয়ত অনুযায়ী। অন্যথা গোনাহগার হবে। আর রোজা সেই জৈবিক তাড়নাকে দমন করে। হাদিসে এসেছে, আর যুবকদের মধ্যে যাদের বিয়ে করার সক্ষমতা নেই, তাঁরা যেন সওম পালন করে। কেননা, সাওম জৈবিক তাড়নাকে দমন করে।’ (সহিহুল বুখারি, হাদিস নং-৫০৬৫) এসব সুসংবাদ শুধুমাত্র রোজাদারের জন্য। তাই আসুন রমজানের রোজার প্রতি গুরুত্ব দেই। আল্লাহতায়ালা আমাদের সবাইকে পবিত্র রমজানের রোজাগুলো রাখার তাওফিক দান করুন। আমীন!লেখক : মুহাম্মাদ নুরুল ইসলাম

Comments are closed.

%d bloggers like this: