Ultimate magazine theme for WordPress.

৫ বছরে ৩০ দেশে রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়েছে দেড় লাখ বাংলাদেশী

0 23

কামাল উদ্দিন সুমন : এক এক করে তার বিরুদ্ধে মামলা হয় অর্ধশত। জেল-জুলুম নির্যাতন তার নিত্যসঙ্গি ছিল গত সাত বছর। সরকার বিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে দীর্ঘ সময় কারাভোগ করেন। পুলিশের মারধরের শিকার হয়ে নানান জটিল রোগে আক্রান্ত। অবশেষে গত ৮ এপ্রিল পাড়ি জমান আমেরিকায়। তিনি হলেন নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির সেক্রেটারি এটিএম কামাল। তিনি দেশে আর ফিরবেন না প্রবাসে রাজনৈতিক আশ্রয় চাইবেন এমনটা বলেছেন তার রাজনৈতিক অনেক বন্ধু। আমেরিকায় রাজনৈতিক আশ্রয় নিচ্ছেন কিনা এমন প্রশ্নে গতকাল এটিএম কামাল আমেরিকা থেকে দৈনিক সংগ্রামকে জানান, না আমার প্রয়োজন নাই। আমি আমার মেয়ের স্পন্সরে এসেছি। সে এখানকার নাগরিক। আমি যত দিন ইচ্ছা থাকতে পারবো। যখন ইচ্ছা দেশে যাওয়া আসাও করতে পারবো। চিকিৎসা ও বিশেষ প্রয়োজনে তিনি আমেরিকায় গিয়েছেন বলেন জানান।

এর আগে ফেসবুক স্ট্যাটাসে এটিএম কামাল লিখেছেন, আমি আজ মানসিকভাবে বিপর্যস্ত, শারীরিক নানা জটিলতায় ভূগছি। আমার মা, স্ত্রী, ছোট ভাইয়ের স্ত্রী ও মেয়ে গুরুতর অসুস্থ। তার ঊপর দফায় দফায় বাসায় পুলিশের তল্লাশি, ডজন ডজন মামলার ধকল, প্রায়শই ফেরারি জীবন, পুলিশের নির্মম লাঠিপেটা, মাসের পর মাস অসংখ্যবার অসহনীয় কারাবাস। দিনের পর দিন হাজিরার নামে আদালতের বারান্দায় সময়পাড়। তারপরেও মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা, সরকার উৎখাতের গায়েবী মামলা। এর আগেও আমি বলেছি, আমি আজ মানসিক, শারীরিক ও পারিবারিকভাবে বিপর্যস্ত। শুধু এটিএম কামালই নয়; গত ৮ বছরে সরকার বিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে জুলম নির্যাতনের শিকার শত শত নেতাকর্মী দেশ ছেড়েছেন। দেশ থেকে যারাই বিদেশ পাড়ি দিয়েছেন তাদের বেশীর ভাগই রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়ে আবেদন করেছেন সে সব দেশের সরকারের কাছে। এক্ষেত্রে বেশীর ভাগই রয়েছেন ইউরোপে।

সূত্র জানায়, নিপীড়ন, নির্যাতন আর হয়রানিমূলক মামলার দোহাই দিয়ে বাংলাদেশীদের ইউরোপ-আমেরিকায় রাজনৈতিক আশ্রয়ের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) প্রতিবেদন অনুযায়ী গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশের প্রায় দেড় লাখ মানুষ ইউরোপ-আমেরিকার অন্তত ৩০ দেশে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করেছেন। রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীদের মধ্যে জামায়াত ও বিএনপির নেতাকর্মীর সংখ্যাই বেশি। আবার অনেকে ভাগ্যবদলের আশায় বিদেশে গিয়ে স্থায়ী বসবাসের জন্যও রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করেছেন। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ‘পিউ রিসার্চ সেন্টারেরও’সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী বাংলাদেশীদের স্থান ইরাক, সিরিয়া, পাকিস্তান ও সোমালিয়ার পরেই।

দুটি সংস্থার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীরা মানবিক যুক্তি দেখিয়ে ‘পলিটিক্যাল এ্যাসাইলাম’ চাচ্ছেন। প্রথম দিকে কম হলেও গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশীদের রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী দিন দিন বেড়েই চলেছে।

রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থীরা তাদের আবেদনে উল্লেখ করছে, দেশে তাদের বিরুদ্ধে মামলা-হামলা, নির্যাতন-নিপীড়নের কারণে তারা দেশে নিরাপত্তাহীন। তারা দেশে ফিরলে জীবন হুমকির মধ্যে পড়বে। জীবনের নিরাপত্তার জন্য তাদের আশ্রয় দেয়া হোক। গত পাঁচ বছরে বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়ে আবেদন করেছেন এক লাখ ৩৭ হাজার বাংলাদেশী।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, জামায়াত-বিএনপির একটি অংশ দেশে তাদের ওপর জুলুম-নির্যাতনের দোহাই দিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করছে। তারা দেশের বিরুদ্ধে বিদেশের কোর্টে চরম বিদ্বেষ প্রকাশ করছে। বিদেশীরাও বিষয়টি বিশ্বাস করে জামায়াত-বিএনপির অনেক নেতাকর্মীকে রাজনৈতিক আশ্রয় দিচ্ছে। সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করার দেশ ইংল্যান্ড ও ইতালি। এ দুটি দেশে বিএনপি-জামায়াতের হাজার হাজার নেতাকর্মী রাজনৈতিক আশ্রয়ের প্রার্থনা করেছে। তাদের অনেকে রাজনৈতিক আশ্রয়ও পেয়েছে। এদের পাশাপাশি কিছু সাধারণ নাগরিক জীবন-জীবিকার জন্যও রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়েছে। এদের সংখ্যাও কম নয়।

দালাল চক্রের মাধ্যমে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে গেছে তারা। কিন্তু ওসব দেশে কাজের অনুমতি না পাওয়ায় তারা রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করছে। যতদিন কোর্টে বিষয়টি নিষ্পত্তি না হচ্ছে ততদিন তারা কাজের সুযোগ পাচ্ছে। পুলিশ তাদের দেশ থেকে বেরও করে দিতে পারছে না। এভাবে বিদেশে রাজনৈতিক আশ্রয়ের সংখ্যা রাড়ছে। রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকলে পুলিশী ঝামেলা থেকে রেহাই পাওয়া যায়।

 মানবিক ও রাজনৈতিক বিবেচনায় ফ্রান্সে ৩২ হাজার ৭শ’ বাংলাদেশী রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করেছে। বাংলাদেশীদের রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন বেশি জমা পড়েছে ইতালিতে। ইউএনএইচসিআরের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত পাঁচ বছরে দক্ষিণ আফ্রিকায় রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়েছে ২৬ হাজারের বেশি বাংলাদেশী।

জানা গেছে, ২০১৪ সালে যেসব বাংলাদেশী ইউরোপে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করেছিলেন তাদের সংখ্যা ছিল ১০ হাজার। ২০১৫ সালে এ সংখ্যা বেড়ে ১৮ হাজারে দাঁড়ায়। অথচ ২০১৩ সালে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থীর সংখ্যা ছিল মাত্র ৭ হাজার বাংলাদেশী।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ‘পিউ রিসার্চ সেন্টার’-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইউরোপে যেসব নাগরিক রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থনা করছেন তাদের মধ্যে বাংলাদেশীদের স্থান ১৪তম। প্রতিবেদনে ৩০ দেশের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আশ্রয় প্রার্থনাকারীরা ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৮ দেশ বেছে নিয়েছে। এর বাইরে রয়েছে নরওয়ে ও সুইডেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থীদের ৭৩ শতাংশই হলো তরুণ। এদের বয়স ১৮ থেকে ৩৪ বছরের মধ্যে।

ইইউর এক প্রতিবেদন বলছে, ২০১২ থেকে ২০১৬ এ পাঁচ বছরে ৬৪ হাজার ২১৫ জন বাংলাদেশী ইইউর বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেছে। রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়ে ইইউর সর্বশেষ প্রকাশিত এ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সালে ৬ হাজার ৫৮৫, ২০১৩ সালে ৯ হাজার ৩৫০, ২০১৪ সালে ১১ হাজার ৯০৫, ২০১৫ সালে ১৯ হাজার ১২০ এবং ২০১৬ সালে ১৭ হাজার ২৫৫ জন বাংলাদেশী রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়ে আবেদন করেছে। এর মধ্যে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে ২০১২ সালে ৭ হাজার ৯২৫, ২০১৩ সালে ৭ হাজার ৭৫০,২০১৪ সালে ৬ হাজার ৭৯৫, ২০১৫ সালে ৯ হাজার ৪৬০ এবং ২০১৬ সালে ১১ হাজার ৭১৫ জন বাংলাদেশীর আবেদন।

Leave A Reply

Your email address will not be published.