নানা সাফল্য-ব্যর্থতায় আওয়ামী লীগের পথচলা

নানা সাফল্য-ব্যর্থতায় আওয়ামী লীগের পথচলা

6

নানা সাফল্য-ব্যর্থতায় আওয়ামী লীগের পথচলা

আজ ২৩ জুন। নানা ঘাত-প্রতিঘাত আর চড়াই-উৎরাইয়ের মধ্য দিয়ে বাহাত্তর পেরিয়ে তিয়াত্তর বছরে পা রাখছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। ১৯৪৯ সালের এই দিনে পুরান ঢাকার কে এম দাস লেন রোডের রোজ গার্ডেন প্যালেসে প্রতিষ্ঠা লাভ করে বৃহৎ এই রাজনৈতিক দলটি। দীর্ঘ এই পথচলায় দলটির যেমন অনেক বড় বড় সফলতা রয়েছে, তেমনি কিছু ব্যর্থতাও আছে। কিছু বিতর্কিত কর্মকাে র কারণে বড় বড় সফলতা চাপা পড়ে যাচ্ছে।

প্রতিষ্ঠার ৭২ বছরের ইতিহাসে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ৬৬ সালের ছয় দফা, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রামসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের অর্জন ঐতিহাসিক। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার টানা ২১ বছর পর অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে ৯৬ সালে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। সরকার গঠনের পরেই পার্বত্য শান্তিচুক্তি সম্পাদন করতে সক্ষম হয়। এ ছাড়াও ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করার পর থেকে আজ পর্যন্ত শাসনভার আওয়ামী লীগের হাতেই রয়েছে। টানা তিনবার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকাটা আওয়ামী লীগের বড় কৃতিত্ব এবং বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি রেকর্ডও বটে। এই সময়ের মধ্যে মিয়ানমার ও ভারতের সাথে সমুদ্র বিজয়, ভারতের সাথে ঐতিহাসিক ছিটমহল বিনিময় চুক্তি স্বাক্ষর, মেগা প্রজেক্ট পদ্মা সেতু ও মেট্রোরেলের দৃশ্যমান অগ্রগতিসহ নানা সফলতার দিক রয়েছে।

এ দিকে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দেয়া এক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেছেন, আওয়ামী লীগের লক্ষ্যই হলো দেশকে জাতির পিতার স্বপ্নের ‘সোনার বাংলাদেশ’ এবং বাঙালিদের বিশ্বের বুকে একটি আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমুন্নত রেখে নেতাকর্মী ও সমর্থকরা শত প্রতিকূলতা ও ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে আওয়ামী লীগকে আজ অত্যন্ত মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমার দৃঢ়বিশ্বাস দলের মধ্যে শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো ও গণতন্ত্রের চর্চা অটুট থাকলে কেউ আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবে না। তবে এই সফলতার পাশাপাশি এমন কিছু বিতর্কিত কর্মকা রয়েছে, যা অর্জনগুলোকে স্লান করে দিচ্ছে বলে মনে করেন দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

তাদের মতে, ভারতের সাথে তিস্তা চুক্তির এখনো কোনো সমাধান হয়নি। দেশে উঁচু উঁচু ভবন নির্মাণ হচ্ছে, চার লেন-আট লেনের মহাসড়ক নির্মাণ হচ্ছে, আধুনিক মেট্রোরেলের কাজ এগিয়ে যাচ্ছে কিন্তু দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এখনো সুসংহত হয়নি, জনগণ ভোট বিমুখ হয়ে পড়েছে। যদিও পাকিস্তানের শোষণ-নির্যাতন ও বৈষম্যের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে এ দেশের মানুষ জ্বলে উঠেছিল। দেশ স্বাধীন হয়েছে ঠিকই কিন্তু সত্যিকারের সেই স্বাধীনতা আজো মানুষ ভোগ করতে পারছে না। ধনী-গরিবের বড় বৈষম্য রয়ে গেছে। ধনীক শ্রেণী আরো ধনী হচ্ছে, গরিব মানুষ আরো গরিব হয়ে যাচ্ছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেড়েছে ঠিকই কিন্তু মানুষের জীবনযাত্রার মান সে অর্থে উন্নত হয়নি। এখনো অনাহারে-অর্ধাহারে দিনাতিপাত করছে মানুষ, বৈশ্বিক মহামারী করোনায় তা আরো স্পষ্ট হয়েছে। গুম-খুন অপহরণ, মারামারি, হানাহানি, প্রতিহিংসার রাজনীতি সমাজে এখন নিত্যনৈমত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে দুর্নীতির চিত্র ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে, সমাজের রন্ধে রন্ধে মাদকের হিংস্র থাবা, ধর্ষিত নারী-শিশুদের চিৎকার প্রতিনিয়ত কানে বাজে, বিচারহীনতার সংস্কৃতিতে সামাজিক অবক্ষয় বেড়েছে এবং প্রতিনিয়ত অপরাধীরা কয়েক গুণ শক্তি নিয়ে নিরীহ মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে।

এক প্রতিক্রিয়ায় সুশাসনের জন্য নাগরিক- সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার নয়া দিগন্তকে বলেন, আওয়ামী লীগ একটি ঐতিহ্যবাহী দল, স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছে, বহু গণতান্ত্রিক সংগ্রামে তাদের অনেক ভূমিকা ও সাফল্য রয়েছে। তবে দুর্ভাগ্যবশত সাম্প্রতিককালে গত তিন মেয়াদে তাদের সফলতা বলতে গেলে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কিছু অবদান রেখেছে। কিন্তু অন্যান্য ক্ষেত্রে তাদের যে ব্যর্থতা দেখা যাচ্ছে, এর মধ্যে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো নির্বাচনীব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা অকার্যকার হয়ে পড়েছে। সবক্ষেত্রে দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়নের বিস্তার ঘটেছে এবং একটা ফায়দার রাজনীতি চর্চা করা হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, আওয়ামী লীগের এখন যে কার্যক্রম তাতে তাদের অতীত ইতিহাস-ঐতিহ্যের সাথে মেলে না। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা অকার্যকর হওয়া মানে ভোট নিয়ে মানুষের ব্যাপক অনাস্থা সৃষ্টি, সুষ্ঠু-স্বাভাবিক ও শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতার পালাবদলের পথ রুদ্ধ হওয়া। এটা আমাদের চরম সঙ্কটের দিকে ধাবিত করছে। আমি আশা করব, দেশের গণতান্ত্রিক ধারা ফিরিয়ে আনতে আওয়ামী লীগ কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

বিশিষ্ট রাজনীতি বিশ্লেষক গোলাম মাওলা রনি নয়া দিগন্তকে বলেন, আওয়ামী লীগ একটি পুরান ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল। এ দেশের স্বাধীকার আন্দোলন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠাসহ নানা দিক দিয়ে এই দলটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় এই দলের মধ্যে কিছু অসাধু লোকজন ঢুকে পড়েছে। ফলে ঐতিহ্যবাহী এ দলটি গণতান্ত্রিক চরিত্র হারিয়ে ফেলেছে। যেসব লোকজন আওয়ামী লীগের গণতান্ত্রিক চরিত্রে কালিমা লেপন করেছে তাদের পদচারণা বর্তমানে কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আমার আশা থাকবে, যারা দলকে ভালোবাসে, যাদের ত্যাগের বিনিময়ে এই দল এগিয়ে যাচ্ছে তাদের উচিত যারা গণতন্ত্র হরণ করছে, ভোটাধিকার হরণ করছে এবং এই রকম একটা ঐতিহ্যবাহী দলকে যারা সমালোচনার মুখে ফেলে দিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে দলের মধ্যে থেকেই প্রতিবাদ উঠুক। অনাগত দিনে আওয়ামী লীগ গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য ফিরে পাক- এটাই প্রত্যাশা।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচি : দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে আওয়ামী লীগ। তবে বৈশ্বিক মহামারী করোনা কারণে স্বল্প পরিসরে স্বাস্থ্যবিধি মেনে কর্মসূচি পালন করবে দলটি। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে আজ বুধবার সূর্যোদয়ের ক্ষণে কেন্দ্রীয় কার্যালয় ও দেশব্যাপী দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন, সকাল ৯টায় ধানমন্ডি বত্রিশ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ, বিকেল ৪টায় কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আলোচনা সভা। এ ছাড়াও বেলা ১১টায় টুঙ্গীপাড়ায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিতে আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের একটি প্রতিনিধি দল শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করবেন। গতকাল মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সীমিত পরিসরে স্বাস্থ্য সুরক্ষা বিধি মেনে কেন্দ্রীয় কর্মসূচির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কর্মসূচি গ্রহণের পাশাপাশি বিভিন্ন উপযোগী কর্মসূচির মাধ্যমে যথাযথ মর্যাদায় ৭২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করার জন্য আওয়ামী লীগ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের জেলা, উপজেলাসহ সর্বস্তরের নেতাকর্মী, সমর্থকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

Comments are closed.

%d bloggers like this: