রক্তে ভেজা কালজয়ী পথচলা: শহীদুল্লাহ কায়সার ও সংবাদের লড়াইয়ের গল্প

অনলাইনডেস্ক:  বাঙালি জাতির মুক্তির ইতিহাসের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে একটি নাম, ‘দৈনিক সংবাদ’। ৭৬ বছরের দীর্ঘ পরিক্রমায় এই পত্রিকাটি কেবল একটি সংবাদপত্র হিসেবে নয়, বরং স্বাধীনতার পক্ষের এক অবিনাশী কণ্ঠস্বর হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

তবে এই পথচলা কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। এই দীর্ঘ যাত্রার প্রতিটি পাতায় মিশে আছে রক্ত, আত্মত্যাগ আর স্বজন হারানোর হাহাকার। বিশেষ করে একাত্তরের উত্তাল দিনগুলোতে সংবাদ-এর ওপর যে আঘাত এসেছিল, তা বিশ্বের সংবাদপত্রের ইতিহাসের এক কলঙ্কময় অধ্যায়। সেই রক্তক্ষয়ী ইতিহাসের কেন্দ্রে রয়েছেন এক কিংবদন্তি সাংবাদিক ও লেখক, দৈনিক সংবাদের তৎকালীন বার্তা সম্পাদক শহীদুল্লাহ কায়সার।

পুড়ে ছাই হলেও দমে যায়নি সংবাদের কণ্ঠ

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যখন ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিল দৈনিক সংবাদ-এর কার্যালয়। স্বাধীনতার পক্ষে শুরু থেকেই আপসহীন অবস্থানের কারণে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের চক্ষুশূল ছিল এই পত্রিকা।

সেই কালরাতে সংবাদ-এর বংশালস্থ কার্যালয়ে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। লেলিহান শিখায় ভস্মীভূত হয় ছাপাখানা, নথিপত্র আর অগণিত স্বপ্ন। আগুনে পুড়ে শহীদ হন সাংবাদিক সাবের আহমেদ। পাকিস্তান সরকার ও তাদের সমর্থকরা ভেবেছিল আগুন দিয়ে সংবাদ-এর মুখ বন্ধ করে দেওয়া যাবে। কিন্তু তারা বুঝতে পারেনি, আদর্শের যে আগুন বাঙালির হৃদয়ে সংবাদ জ্বালিয়ে দিয়েছিল, তা নেভানো সম্ভব ছিল না।

শহীদুল্লাহ কায়সার: কলম যোদ্ধা থেকে অকুতোভয় শহীদ

দৈনিক সংবাদ-এর প্রাণভোমরা ছিলেন বুদ্ধিজীবী শহীদুল্লাহ কায়সার। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা সাহিত্যেও তিনি ছিলেন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। বার্তা সম্পাদক হিসেবে তিনি সংবাদ-কে কেবল খবরের কাগজ হিসেবে নয়, বরং আন্দোলনের হাতিয়ার হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। ২৫ মার্চের অগ্নিকাণ্ডের পর আত্মগোপনে থেকেও তিনি কলম থামাননি। অবরুদ্ধ ঢাকা থেকে তিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্বাধীনতার সপক্ষে কাজ করে গেছেন। পাকিস্তানি সেনাদের ওপর নজরদারি আর মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে তথ্য পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ছিল অনন্য। কিন্তু এই নিরব লড়াইয়ের খবর পৌঁছে গিয়েছিল ঘাতকদের কানে।

বিজয়ের প্রাক্কালে সেই নৃশংসতম অন্তর্ধান

নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর যখন বাংলাদেশ বিজয়ের ঠিক দ্বারপ্রান্তে, সারা দেশের মানুষ যখন মুক্তির অপেক্ষায় প্রহর গুনছে, তখনই নেমে আসে অন্ধকার। ১৪ ডিসেম্বর, ১৯৭১। পরাজয় নিশ্চিত জেনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার, আলবদর ও আলশামস বাহিনীর সহযোগিতায় মেতে ওঠে এক পৈশাচিক বুদ্ধিজীবী নিধনযজ্ঞে।

সেই তালিকায় অন্যতম প্রধান নাম ছিল শহীদুল্লাহ কায়সার। সেদিন বিকেলে রাজধানীর কায়েতটুলির বাসা থেকে তাকে ধরে নিয়ে যায় আলবদর বাহিনীর সদস্যরা। শহীদুল্লাহ কায়সারের স্ত্রী পান্না কায়সার পরবর্তীতে অপহরণকারীদের মধ্যে একজনকে শনাক্ত করেছিলেন, তিনি হলেন খালেক মজুমদার। পান্না কায়সারের সাক্ষ্য অনুযায়ী, শহীদুল্লাহ কায়সারকে তুলে নিয়ে খালেক মজুমদার আল-বদর বাহিনীর অপারেশন ইনচার্জ চৌধুরী মুঈনুদ্দীন এবং আশরাফুজ্জামান খানের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। ১৪ ডিসেম্বর তুলে নেওয়ার পর শহীদুল্লাহ কায়সারের মরদেহ আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। পরবর্তী সময়ে ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি তাঁর ভাই জহির রায়হান তাকে খুঁজতে গিয়ে নিজেও নিখোঁজ হন। খালেক মজুমদারকে পরবর্তীতে এই হত্যার জন্য অভিযুক্ত করা হয়েছিল, যিনি আদালতে বলেছিলেন যে তিনি শহীদুল্লাহ কায়সারকে চৌধুরী মুঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামানের হাতে তুলে দিয়েছিলেন।

শহীদুল্লাহ কায়সার আর ফিরে আসেননি। বিজয়ের লাল সূর্য ওঠার ঠিক আগমুহূর্তে এক মেধাবী সাংবাদিককে হারায় জাতি। তার অপরাধ ছিল তিনি সত্য বলতেন, তিনি স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখতেন এবং তিনি সংবাদ-এর মাধ্যমে সেই স্বপ্ন মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিতেন।

৭৬ বছরের অহংকার ও দায়বদ্ধতার উত্তরাধিকার

আজ দৈনিক সংবাদ যখন ৭৬ বছরে পা দিচ্ছে, তখন ফিরে তাকালে দেখা যায় এক মহাকাব্যিক লড়াইয়ের ছবি। একটি পত্রিকা কীভাবে নিজের কার্যালয় পুড়িয়ে দেওয়ার পরও ফিনিক্স পাখির মতো ধ্বংসস্তূপ থেকে জেগে উঠতে পারে, সংবাদ তার প্রমাণ। সংবাদ কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি সেই সব শহীদের রক্তের ঋণে গড়া এক প্রতিষ্ঠান। বর্তমানের আধুনিক সাংবাদিকতার ভিড়ে সংবাদ আজও তার সেই পুরনো তেজ ধরে রেখেছে। ৭৬ বছরের এই জয়যাত্রায় শহীদুল্লাহ কায়সারের আদর্শই পত্রিকাটির মূল চালিকাশক্তি।

বাংলার গণমানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে সংবাদ আজও অবিচল। আজ এই বিশেষ দিনে জাতি বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করছে শহীদুল্লাহ কায়সারসহ সেই সব সংবাদকর্মীকে, যারা একটি স্বাধীন মানচিত্রের জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। সংবাদের এই দীর্ঘ পথচলা আগামী প্রজন্মের সাংবাদিকদের জন্য এক বড় অনুপ্রেরণা। কারণ, সংবাদ আমাদের শেখায় কীভাবে ধ্বংসের ভেতর থেকেও সৃষ্টির উল্লাসে মেতে উঠতে হয় এবং কীভাবে রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতাকে অক্ষুণ্ণ রাখতে কলম চালাতে হয়। শহীদুল্লাহ কায়সারের স্বপ্ন আর দৈনিক সংবাদের আপসহীন যাত্রা আজ আমাদের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *