অনলাইন ডেস্ক: মানুষকে আল্লাহ তা‘আলা যে অসংখ্য নিয়ামত দান করেছেন, তার মধ্যে জিহবা বা কথা বলার ক্ষমতা অন্যতম। এই সামান্য অঙ্গই মানুষের জান্নাত বা জাহান্নামের পথ নির্ধারণ করে দিতে পারে। আমরা প্রতিদিন প্রয়োজন-অপ্রয়োজনে অসংখ্য কথা বলি কিছু কথা সত্য ও কল্যাণকর, আবার অনেক কথা অসতর্কতা, আবেগ কিংবা প্রবৃত্তির বশবর্তী হয়ে বেরিয়ে আসে, যার পরিণাম সম্পর্কে আমরা প্রায়ই উদাসীন থাকি।
অথচ আল্লাহ তা‘আলা আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, “মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তা লিপিবদ্ধ করার জন্য তার কাছে সদা প্রস্তুত পর্যবেক্ষক রয়েছে।”
(সুরা ক্বাফ: ১৮)
এই আয়াত আমাদেরকে গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করে আমরা যে কথা বলি, তা কেবল বাতাসে মিলিয়ে যায় না; বরং আমলের খাতায় চিরস্থায়ীভাবে সংরক্ষিত হয়ে যায়।
ইসলাম শুধু ইবাদতে নয়, কথাবার্তায়ও ন্যায় ও ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার শিক্ষা দেয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,“তোমরা যখন কথা বলবে, স্বজনদের বিরুদ্ধেও হলেও ন্যায়সংগত কথা বলবে।”
(সুরা আন‘আম: ১৫২)
এখানে আবেগ, আত্মীয়তা বা ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আল্লাহ বলেন, “হে মু’মিনগণ! আল্লাহকে ভয় করো এবং সঠিক কথা বলো।”
(সুরা আল-আহযাব: ৭০)
সঠিক কথা শুধু সত্য হওয়াই যথেষ্ট নয়; তা হতে হবে ন্যায়সঙ্গত, কল্যাণকর ও আল্লাহভীরুতার প্রতিফলন। আল্লাহ তা‘আলা আরও সুস্পষ্টভাবে বলেন, “হে মু’মিনগণ! তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে সাক্ষ্যদানকারী ও সুবিচার প্রতিষ্ঠাকারী হও… যদি তোমরা কথা ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে বল বা পাশ কাটিয়ে যাও, তবে নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের সমস্ত কর্ম সম্পর্কে অবগত।”
(সুরা আন-নিসা: ১৩৫)
এ আয়াত আমাদের শেখায়, কথা বিকৃত করা, সত্য আড়াল করা কিংবা কৌশলে এড়িয়ে যাওয়া সবই আল্লাহর কাছে দায়বদ্ধতার বিষয়।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাস করে, সে যেন উত্তম কথা বলে, নতুবা চুপ থাকে।”
(বুখারী ও মুসলিম) এ হাদীস আমাদের জন্য একটি সোনালি নীতিমালা: কথা যদি কল্যাণকর না হয়, তবে নীরবতাই ইবাদত। আরও সতর্ক করে তিনি বলেন, “অধিকাংশ মানুষ তাদের জিহবার দ্বারা সংঘটিত পাপের কারণেই জাহান্নামে যাবে।”
(তিরমিযি)
এটি আমাদের জন্য এক গভীর আত্মসমালোচনার আহ্বান
আমি যা বলছি, তা কি আমাকে আল্লাহর নিকটবর্তী করছে, নাকি দূরে সরিয়ে দিচ্ছে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “সত্যবাদিতা পূণ্যের দিকে নিয়ে যায়, আর পূণ্য মানুষকে জান্নাতের দিকে নিয়ে যায়। পক্ষান্তরে মিথ্যা পাপের দিকে নিয়ে যায়, আর পাপ মানুষকে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়।”
(বুখারী)
অতএব সত্য বলা শুধু সামাজিক গুণ নয়; এটি আখিরাতের পথনির্দেশক। জিহবার সংযম আত্মশুদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর। সালাফে সালেহিনরা বলতেন,“তোমার জিহবাকে বন্দী করো, নইলে সে তোমাকে বন্দী করবে।”
আজ আমাদের প্রয়োজন, কথা বলার আগে ভাবা সত্য হলেও প্রয়োজন ও কল্যাণ বিবেচনা করা। গীবত, মিথ্যা, কটুক্তি ও অহেতুক বিতর্ক থেকে বিরত থাকা, আল্লাহর সন্তুষ্টিকে কথার মানদণ্ড বানানো।
আল্লাহ আমাদেরকে সত্যবাদী, সংযমী ও দায়িত্বশীল হিসেবে গড়ে তুলুন। আমাদের জিহবা হোক সংযত ও হৃদয়ের পবিত্রতার প্রতিচ্ছবি। আমিন।