কাজী:মানুষ সাধারণত মৃত্যু নিয়ে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না। যেন মৃত্যুর কথা উচ্চারণ করলেই তা আরও কাছে চলে আসে, এই এক অদ্ভুত ভ্রান্ত অনুভূতি আমাদের ভেতরে কাজ করে। অথচ মৃত্যু কোনো সম্ভাবনা নয়; মৃত্যু এক অবধারিত সত্য। প্রশ্ন হলো কখন এবং কোন অবস্থায় মৃত্যু হবে।
মালাকুল মউত (আ.) কারো দরজায় কড়া নাড়ার আগে কোনো ঘোষণা দেন না। তিনি বয়স, অবস্থান, স্বাস্থ্য কিংবা পরিকল্পনার অপেক্ষা করেন না। আজ যে মানুষ ভবিষ্যতের শত পরিকল্পনায় ব্যস্ত, আগামী মুহূর্তেই সে অতীতের গল্প হয়ে যেতে পারে। এই বাস্তবতা জেনেও আমরা এমনভাবে বাঁচি, যেন মৃত্যু কেবল অন্যদের জন্য, আমাদের জন্য নয়। আল্লাহ তা’আলা আমাদের এই আত্মভুলে থাকার প্রবণতাকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, “প্রত্যেক প্রাণীই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। আর কিয়ামতের দিন তোমাদেরকে পূর্ণ প্রতিদান দেওয়া হবে। অতঃপর যাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে সে-ই প্রকৃতপক্ষে সফল। আর পার্থিব জীবন তো ধোঁকার ভোগ ছাড়া আর কিছুই নয়।”
(সূরা আলে ইমরান, ৩:১৮৫)
এই আয়াত আমাদের সামনে জীবনের সাফল্যের সংজ্ঞাটিই পাল্টে দেয়। এখানে ডিগ্রি, পদ, খ্যাতি কিংবা সম্পদকে সফলতা বলা হয়নি। সফল বলা হয়েছে তাকেই যে জাহান্নাম থেকে রক্ষা পেয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে। বাকি সব অর্জন যদি আখিরাতের সফলতায় সহায়ক না হয় তবে তা নিছকই এক ধোঁকাপূর্ণ ভোগ। এই সত্য উপলব্ধি করলে একটি অনিবার্য প্রশ্ন আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়, আমরা কি সেই সফলতার জন্য প্রস্তুত হচ্ছি?প্রস্তুতি মানে শুধু কিছু ধর্মীয় আচার পালন নয়; প্রস্তুতি মানে অন্তরের গভীর সংস্কার। তাই আসুন, অন্যকে নয় নিজেকেই প্রশ্ন করি। আমার ঈমান কি সত্যিই শিরকমুক্ত? নাকি আল্লাহর উপর ভরসার কথা বললেও, বাস্তবে আমি মানুষ, ক্ষমতা ও বস্তুগত মাধ্যমের উপরই বেশি নির্ভর করি? আল্লাহ স্পষ্ট করে বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সঙ্গে শিরককে ক্ষমা করেন না।”
(সূরা নিসা, ৪:৪৮)
তাহলে আমার অন্তরের সূক্ষ্ম শিরকগুলো কি আমি চিহ্নিত করতে পেরেছি? আমার ইবাদত কি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম–এর শেখানো পথে চলছে, নাকি সমাজ, সংস্কৃতি ও অভ্যাসের মিশেলে তা বিকৃত হয়ে যাচ্ছে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সতর্ক করে বলেছেন, “যে আমাদের দ্বীনে এমন কিছু সংযোজন করল, যা এর অন্তর্ভুক্ত নয়—তা প্রত্যাখ্যাত।”
(সহীহ মুসলিম, ১৭১৮)
আমার আমল কি সত্যিই গ্রহণযোগ্য হওয়ার শর্ত পূরণ করছে? আমার অন্তর কতটা পরিষ্কার? আমি কি হিংসা, বিদ্বেষ, অহংকার ও আত্মশ্রেষ্ঠতার রোগ থেকে মুক্ত? কিয়ামতের দিন সম্পদ বা সম্পর্ক কোনো কাজে আসবে না,
“সেদিন উপকারে আসবে না কোনো ধন-সম্পদ বা সন্তান; বরং উপকারে আসবে শুধু বিশুদ্ধ হৃদয়।”
(সূরা শু‘আরা, ২৬:৮৮–৮৯)
আমার হৃদয় কি সেই বিশুদ্ধতার পথে আছে? আমি কি আল্লাহর বান্দাদের হক নিয়ে সতর্ক? কত নামাজ, কত নফল সবই অর্থহীন হয়ে যেতে পারে, যদি মানুষের অধিকার নষ্ট করে থাকি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, কিয়ামতের দিনে প্রকৃত দেউলিয়া সেই ব্যক্তি যার ইবাদত থাকবে, কিন্তু মানুষের উপর জুলুম করার কারণে সব নেকি বিতরণ হয়ে যাবে। (সহীহ মুসলিম)
আমি কি সেই ভয়াবহ দেউলিয়াত্বের ঝুঁকি নিচ্ছি? আমি কি আল্লাহকে যথাযথ ভয় করি? এমন ভয়, যা হৃদয়কে সংশোধন করে আতঙ্ক নয়, বরং সচেতনতা তৈরি করে। আল্লাহ বলেন,“আল্লাহকে প্রকৃত অর্থে ভয় করে তাঁরাই, যারা জ্ঞানী।”
(সূরা ফাতির, ৩৫:২৮)
আমার জ্ঞান কি আমাকে বিনয়ী করছে, না অহংকারী? সবশেষে, সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন, আমি কি পূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করেছি, নাকি নিজের সুবিধামতো অংশবিশেষ গ্রহণ করেছি? আল্লাহর আহ্বান স্পষ্ট,
“হে মু’মিনগণ! তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করো।”
(সূরা বাকারা, ২:২০৮)
সত্য কথা বলতে গেলে এই প্রশ্নগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে নির্দ্বিধায় ‘হ্যাঁ’ বলা সহজ নয়। আর এই অস্বস্তিটাই হয়তো আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের জন্য এক দয়ার সংকেত যাতে আমরা এখনই থেমে যাই, ফিরে তাকাই, এবং সংশোধনের পথে হাঁটি। কারণ আল্লাহ তা’আলা নিরাশ হতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং আত্মশুদ্ধিকারীদের ভালোবাসেন।”
(সূরা বাকারা, ২:২২২)
তাই আসুন, কাল নয় আজই; লোক দেখানোর জন্য নয় আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য; ওহীর আলোকে আত্মসংস্কারকে অগ্রাধিকার দিই। মৃত্যু আসবে প্রস্তুতি থাকুক বা না থাকুক। কিন্তু সৌভাগ্যবান সেই ব্যক্তি যার মৃত্যু তাকে চমকে দেয় না বরং যার মৃত্যু তার প্রস্তুতির সাক্ষ্য দেয়। আল্লাহ তা’আলা আমাদের সবাইকে সেই সৌভাগ্যবানদের অন্তর্ভুক্ত করুন। আমিন।